এই লেখাটি ইংরেজিমালয়লামেও পড়তে পারেন।

তাজিকিস্তানে কাফা নেশনস কাপে দুর্দান্ত জয় দিয়ে অভিযান শুরু করল ভারত। শুক্রবার তারা ফিফা ক্রমতালিকায় তাদের চেয়ে ২৭ ধাপ ওপরে থাকা তাজিকিস্তানকে ২-১-এ হারিয়ে টুর্নামেন্টের নক আউট পর্বের দিকে কিছুটা এগিয়ে গেল। ১৮ বছরে এই প্রথম তাজিকিস্তানের বিরুদ্ধে জয় পেল ভারত

এ দিন হিসরের সেন্ট্রাল স্টেডিয়ামে অসাধারণ লড়াই করে নীল-বাহিনী। ১৩ মিনিটের মধ্যেই দু’টি গোল করে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে দেয় তারা। পাঁচ মিনিটের মাথায় তারকা ডিফেন্ডারআনোয়ার আলি গোল করে প্রথমে দলকে এগিয়ে দেন। ১৩ মিনিটের মাথায় দলের আর এক ডিফেন্ডারসন্দেশ ঝিঙ্গন ব্যবধান বাড়িয়ে নেন। তাজিকিস্তান একটি গোল শোধ করে ২৩ মিনিটের মাথায়, যখন সাহরম সামিয়েভ তাঁর দলের একমাত্র গোলটি করেন

এর পর আয়োজকেরা অজস্র গোলের সুযোগ তৈরি করলেও দুর্ভেদ্য ভারতীয় রক্ষণের তৎপরতায় তারা সফল হতে পারেনি। এমনকী দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টি থেকে গোল করার সুযোগ পেয়েও সফল হয়নি তারা। ভারতের অভিজ্ঞ গোলকিপারগুরপ্রীত সিং সান্ধু এ দিন অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখান। এ দিন জীবনের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স দেখান তিনি। পেনাল্টি ছাড়াও সেটপিস ও ওপেন প্লে থেকে প্রতিপক্ষের একাধিক অবধারিত গোল একা আটকেছেন তিনি

ভূয়ষী প্রশংসা করা উচিত ভারতীয় দলের ডিফেন্ডারদেরও। প্রতিপক্ষের প্রবল চাপ সামলে এ দিন ম্যাচের শুরুর দিকে পাওয়া জোড়া গোলের সম্মান বজায় রাখে তারা। ভারতীয় দলের নতুন কোচ খালিদ জামিল, ১৩ বছর পর যিনি একজন ভারতীয় হিসেবে জাতীয় দলকে প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, প্রথম ম্যাচেই তিনি প্রমাণ করে দিলেন, দলের ছেলেদের মধ্যে কতটা লড়াইয়ের মানসিকতা তৈরি করে দিয়েছেন। এ দিন ভারতীয় দলের মূলমন্ত্র ছিল লড়াই, সংগ্রাম। এই দুই মন্ত্রেই দীক্ষিত হয়ে মাঠে নেমে সাফল্য অর্জন করল তারা।

এ দিন সারা ম্যাচে তাজিকিস্তানের ১৭টি শটের মধ্যে সাতটি ছিল গোলমুখী। তার মধ্যে মাত্র একটি তারা জালে জড়াতে পেরেছে। অন্যদিকে, ভারতের আটটি শটের মধ্যে চারটি ছিল বার ও পোস্টের মধ্যে। পরিসংখ্যানও বুঝিয়ে দিচ্ছে এ দিন কতটা মরিয়া হয়ে ওঠে তাজিকিস্তান এবং কতটা চাপ সামলে সাফল্য অর্জন করতে হয়েছে ভারতকে।

শুরু থেকেই প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার প্রবণতা দেখা যায় ভারতের পারফরম্যান্সে। সামনে বিক্রম প্রতাপ সিং ও ইরফান ইয়াডওয়াডকে রেখে ৪-৪-২-এ দল সাজান ভারতীয় কোচ খালিদ জামিল। চতুর্থ মিনিটেই বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করেন আশিক কুরুনিয়ান। তবে লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতের পায়ে পৌঁছনোর আগেই বল ক্লিয়ার হয়ে যায়।

কিন্তু পরমুহূর্তেই যে ভাবে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন আনোয়ার আলি, তার কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। মহম্মদ উভেয়সের লম্বা থ্রো যখন বক্সের মধ্যে গিয়ে পড়ে, তখন প্রতিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের হেড থেকে বল আসে আনোয়ারের মাথায়। কোণাকুনি জোরালো হেডে তিনি বল গোলের দিকে পাঠান। গোললাইনে দাঁড়িয়ে তা বাঁচানোর চেষ্টা করেন তাজিকিস্তানের অধিনায়ক আখতাম নাজারভ। কিন্তু তাঁর চেষ্টা ব্যর্থ হয় ও বল জালে জড়িয়ে যায় (১-০)

এত তাড়াতাড়ি গোল খেয়ে কিছুটা হকচকিয়ে যায় তাজিক ফুটবলাররা। তাঁরা গোল শোধ করার জন্য চেষ্টা শুরু করে, তবে তাতে তেমন আগ্রাসন ছিল না। ভারতীয় ডিফেন্ডাররাও ব্যবধান বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট তৎপর ছিলেন।

তবে ভারতের পাল্টা আক্রমণে যে ১৩ মিনিটের মাথায় আবার গোল খেয়ে যাবে তারা, তা বোধহয় ভাবতেও পারেনি। এই গোলটিও অসাধারণ এবং সুপরিকল্পিত। বক্সের ডানদিক থেকে ক্রস ভাসিয়ে দেন আনোয়ার। বক্সের মাঝখানে থাকা রাহুল ভেকে সেই উড়ে আসা ক্রস হেড করে গোলের দিকে পাঠান, যা গোলকিপার মুহরিদ্দিন হাসানভ আটকে দিলেও বল ছিটকে আসে তাঁর সামনে থাকা অরক্ষিত সন্দেশ ঝিঙ্গনের পায়ে। বল গোলে ঠেলতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার (২-০)

ঘরের মাঠে দু’গোলে পিছিয়ে যাওয়ায় বেশ চাপে পড়ে যায় তাজিকিস্তান এবং গোল শোধ করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তারা। নিজেদের বক্সের মধ্যে ভারতীয়রা প্রতিপক্ষের অ্যাটাকারদের কড়া পাহারায় রাখেন। যার ফলে বক্সের বাইরে থেকেই দূরপাল্লার শটে গোল করার চেষ্টা শুরু করে তাজিকিস্তান। তবে ২৩ মিনিটের মাথায় তাদের প্রথম গোলটি আসে বক্সের মধ্যে থেকেই।

প্রথমে এহসোনি পাশানবে তাঁর মার্কার সুরেশকে ধোঁকা দিয়ে বল নিয়ে বক্সে ঢোকেন ও বল বাড়ান শেরিদ্দিন বোবোয়েভকে। তিনি গোলের পাস দেন সামিয়েভকে, যাঁর সঙ্গে লেগে ছিলেন সন্দেশ। কিন্তু তাঁর বাধা সত্ত্বেও বাঁদিক থেকে কোণাকুনি শটে গোলের ওপরের কোণ দিয়ে বল জালে জড়িয়ে দেন সামিয়েভ (২-১)

এর তিন মিনিট পরেই ব্যবধান বাড়ানোর ব্যবস্থা প্রায় করেই ফেলেছিলেন আনোয়ার আলি। বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শট রেখেছিলেন গোলে। কিন্তু প্রতিপক্ষের গোলকিপার হাসানভ লাফিয়ে উঠে বল বারের ওপর দিয়ে বার করে দিয়ে দলকে বাঁচিয়ে নেন।

এরপর থেকেই ভারতকে ক্রমশ কোণঠাসা করা শুরু করে তাজিকিস্তান এবং ঘনঘন আক্রমণে ভারতীয় রক্ষণকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। এই সময় সন্দেশ, আনোয়ার, রাহুলরাও দারুনভাবে নিজেদের দূর্গ সামলান। বিশেষ করে প্রতিপক্ষের সেটপিসগুলিকে তাঁরা একের পর এক বানচাল করে দিতে থাকেন।

জিকসন, ছাঙতেরা দুই উইং দিয়ে পাল্টা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করলেও দলের বেশিরভাগ ফুটবলারই রক্ষণ সামলাতে ব্যস্ত ছিলেন। ফলে তাদের আক্রমণ তখন অতটা জোরালো হয়ে উঠতে পারেনি। ২-১-এ এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় ভারত। এই অর্ধের শুরুর দিকটা ভারতের দাপট দেখা গেলেও পরের দিকে আয়োজক দেশই দাপুটে ফুটবল খেলে।

দ্বিতীয়ার্ধে চাপ বজায় রাখে তাজিকিস্তান। বরং ক্রমশ চাপ বাড়াতে থাকে তারা। তবে তাদের প্রবল চাপের মুখে ভেঙে পড়েনি ভারতীয় রক্ষণ এবং গোলকিপার গুরপ্রীত সিং সান্ধু। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার সংমিশ্রণে ভারতকে একাধিক বিপদের হাত থেকে বাঁচান দলনেতা।

দ্বিতীয়ার্ধের খেলা দশ মিনিট গড়ানোর পর রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে দানিশ ফারুখ, নিখিল প্রভু ও নাওরেম মহেশকে নামান খালিদ। তুলে নেন সুরেশ, জিকসন ও ছাঙতেকে। তরতাজা খেলোয়াড়রা মাঠে এলেও ভারত আক্রমণে তীব্রতা বাড়াতে পারেনি। বরং প্রতিপক্ষের একের পর এক আক্রমণে হিমশিম খেয়ে যায় তারা। তবে কোনওমতেই গোলের মুখ খুলতে দিতে রাজি ছিলেন না আনোয়াররা।

আক্রমণের ঝড়ের মধ্যে ৭০ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি আদায় করে নেন তাজিকিস্তানের পরিবর্ত খেলোয়াড় রুস্তম সইরভ। বক্সের বাইরে থেকে উড়ে আসা বল রিসিভ করার চেষ্টা করেন তিনি। পিছন থেকে তাঁকে আটকানোর চেষ্টা করতে গিয়ে তাঁর কাঁধ টেনে ধরেন বিক্রম প্রতাপ। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন সইরভ এবং রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ভারতীয় ফুটবলাররা সমবেত ভাবে প্রতিবাদ জানালেও সহকারী রেফারিদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন উজবেকিস্তানের রেফারি নোরসাফারভ ফিরদাভস।

সতীর্থ ভুল করলেও ভুল করেননি গুরপ্রীত। ডানদিকে ডাইভ দেন সইরভের স্পট কিক আটকাতে। হাতের নাগাল না পেলেও তিনি বল পেয়ে যান পায়ের নাগালে এবং পাল্টা শট নেন বলে, যা অনেক দূরে গিয়ে ছিটকে পড়ে। ফলে ফিরতি বলেও গোলের সুযোগ পায়নি তাজিকরা।

ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হতে যখন আর সাত মিনিট বাকি, তখন চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন ইরফান ইয়াডওয়াড। পরের মিনিটেই আশিক কুরুনিয়ানকে তুলে রোশন সিং নাওরেমকে নামান খালিদ। ম্যাচের শেষ দিকে পাল্টা আক্রমণে ওঠে ভারত এবং নাওরেম মহেশের একটি দূরপাল্লার গোলমুখী জোরালো শট হাসানভ অসাধারণ সেভ না করলে অবধারিত গোল পেত ভারত

ম্যাচের শেষ দিকে সমতা আনার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে তাজিকিস্তানও। তবে বুক চিতিয়ে লড়াই করে যান ভারতীয় দলের ফুটবলাররা। ৮৮ মিনিটের মাথায় অবধারিত গোল বাঁচান গুরপ্রীত। আট মিনিটের সংযুক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে পরিবর্ত খেলোয়াড় ভাহদাত হানোনভের হেড অল্পের জন্য দ্বিতীয় পোস্টের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়

সেই সময়ে প্রায় পুরো ভারতীয় দলকেই নিজেদের দূর্গ রক্ষা করতে দেখা যায়। নিজেদের গোলের সামনে কার্যত পাঁচিল তুলে দিয়েছিলেন তাঁরা। সেই পাঁচিলে ফাটল ধরিয়ে আর জালে বল জড়াতে পারেনি তাজিকিস্তান

ম্যাচের পরে অন্যতম গোলদাতা সন্দেশ ঝিঙ্গন সম্প্রচারকারী সংস্থাকে বলেন, “এখানে আসার আগে ভাল প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা। এমন একটা জয়ের অপেক্ষায় ছিলাম আমরা। এই জয় থেকে যে আত্মবিশ্বাস পেলাম আমরা, আগামী ম্যাচগুলোতে তা আমাদের কাজে লাগাতে হবে”।