এএফসি কাপে পরপর দুটি ম্যাচে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়ার পর মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের ফোকাস এখন শুধুমাত্র ইন্ডিয়ান সুপার লিগে, যেখানে তারা টানা চার ম্যাচে জিতেছে। কিন্তু টানা চার ম্যাচে জয়ের পরও লিগ টেবলের তিন নম্বরে! তারাই যেখানে একমাত্র দল, যারা এ পর্যন্ত সব ম্যাচেই জিতেছে, তা সত্ত্বেও কী করে তারা তিন নম্বরে? কারণ, অন্যদের চেয়ে ম্যাচ কম খেলেছে সবুজ-মেরুন বাহিনী। 

কেরালা ব্লাস্টার্স এফসি, বেঙ্গালুরু এফসি-র যেখানে চলতি লিগে আটটি করে ম্যাচ খেলা হয়ে গিয়েছে, সেখানে মোহনবাগান খেলেছে মাত্র চারটি ম্যাচ! আসলে মাঝখানে পরপর এএফসি কাপের ম্যাচ খেলতে হওয়ায় আইএসএলের ম্যাচ সংখ্যায় তারা পিছিয়ে পড়েছে। এখন অবশ্য আর সেই অর্থে এএফসি কাপের চাপ নেই তাদের ওপর। তাই সবুজ-মেরুন বাহিনীর নজর এবার দেশের এক নম্বর লিগে। তাদের সাফল্যের শতকরা হার যেখানে একশো, শনিবার হায়দরাবাদ এফসি-র বিরুদ্ধে ম্যাচে সেখানে এই হার বজায় রাখাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। কিন্তু সম্প্রতি তাদের দলের যা হাল হয়েছে, শনিবার কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে তারা সেই লক্ষ্য পূরণ করতে পারবে কি না, এই প্রশ্নও উঠতে শুরু করে দিয়েছে। 

দলের অনেকেরই চোট এবং অনেকেই ফর্মে নেই। এই অবস্থায় খেলতে নেমে দলের বেহাল দশা ফুটে ওঠে এএফসি কাপের দুটি ম্যাচে। ঢাকার বসুন্ধরা কিংস ও ওডিশা এফসির বিরুদ্ধে দুই ম্যাচে সাত গোল খায় তারা। তিনটির বেশি গোল শোধ করতে পারেনি। ভঙ্গুর রক্ষণ, ব্যর্থ আক্রমণ ও টালমাটাল মাঝমাঠ নিয়ে শনিবার কী ভাবে লড়াই করবে সবুজ-মেরুন বাহিনী, সেটাই দেখার। 

যদিও হায়দরাবাদ এফসি-র অবস্থা আরও খারাপ। সাতটি ম্যাচ খেলা হয়ে গিয়েছে তাদের। কিন্তু এই সাতটির একটিও জিততে পারেনি গতবারের সেমিফাইনালিস্টরা। তাদের চেয়ে বেশি সংখ্যক ম্যাচ ড্র করায় পাঞ্জাব এফসি এখন লিগ তালিকায় তাদের চেয়ে ওপরে, আর হায়দরাবাদ সবার নীচে। দলটার এই দশা আইএসএলে এর আগে কখনও দেখা যায়নি। তার ওপর এটি নামেই হায়দরাবাদের হোম ম্যাচ। বিশেষ কারণে হায়দরাবাদ থেকে ম্যাচটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ভুবনেশ্বরে। ফলে ঘরের মাঠের সমর্থনও পাবে না তারা। এই অবস্থায় থাকা হায়দরাবাদকে সামনে পেয়েও কি তাদের হারাতে পারবে না মোহনবাগান?       

সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স 

হায়দরাবাদ এফসি: গত মরশুমে দুই নম্বরে থেকে লিগ শেষ করার পরে সেমিফাইনালে তৎকালীন এটিকে মোহনবাগানের কাছে হেরে ছিটকে যায় হায়দরাবাদ এফসি। গত মরশুমের দাপটের ছিটেফোঁটাও এই মরশুমে দেখাতে পারেনি তারা। মরশুমের শুরুতে ডুরান্ড কাপে লিগ পর্ব থেকেই ছিটকে যায় তারা। আইএসএলে এখন পর্যন্ত কোনও ম্যাচে জিততে পারেনি তারা। প্রথম ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল তাদের ২-১-এ হারায়। এর পর জামশেদপুর ও চেন্নাইনের কাছেও হারে তারা। প্রথম পয়েন্ট অর্জন করে মুম্বই সিটি এফসি-র বিরুদ্ধে ড্র করে। বেঙ্গালুরু ও পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে পরবর্তী দুই ম্যাচেও ড্র করে তারা। গত ম্যাচে কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে চতুর্থ হারের মুখে দেখে গতবারের সেমিফাইনালিস্টরা।  

মোহনবাগান এসজি: লিগের প্রথম ম্যাচে যতটা দাপুটে ফুটবল খেলে পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে জেতে মোহনবাগান এসজি, দ্বিতীয় ম্যাচে বেঙ্গালুরু এফসি-র বিরুদ্ধে ততটা দাপট দেখাতে পারেনি তারা। সারা ম্যাচে মাত্র একটি শট তিন কাঠির মধ্যে রেখেছিল তারা এবং সেই শটেই গোল করে জয় এনে দেন ফরাসি মিডফিল্ডার হুগো বুমৌস। চেন্নাইয়ে যে আত্মবিশ্বাস ও আধিপত্য নিয়ে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজত্ব করে তারা, তাতে একবারও মনে হয়নি সেটি তাদের ঘরের মাঠ নয়। জামশেদপুরে এক গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষে ৩-২-এ জেতে সবুজ-মেরুন বাহিনী। ফিটনেসের কারণে সে দিন খেলতে পারেননি মোহনবাগান সুপার জায়ান্টের ডিফেন্ডার আনোয়ার আলি, মিডফিল্ডার হুগো বুমৌস ও স্ট্রাইকার জেসন কামিংস। তবু এক গোলে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় আরমান্দো সাদিকু, লিস্টন কোলাসো ও কিয়ান নাসিরির গোলে জেতে। কিন্তু এএফসি কাপের দুটি ম্যাচে হার তাদের আত্মবিশ্বসাসে আঘাত করেছে। 

দুই শিবিরের খবর 

হায়দরাবাদ এফসি: আইএসএলের অন্যতম ধারাবাহিক ও সফল দলটি এ বার তাদের বাহিনী ঢেলে সাজিয়েছে। কোচ মানোলো মার্কেজের সঙ্গে দল ছেড়েছেন একাধিক তারকা। হাভিয়ে সিভেরিও, বোরহা হেরেরা যোগ দিয়েছেন ইস্টবেঙ্গলে। এ ছাড়া আকাশ মিশ্র, হালিচরণ নার্জারি, জোয়েল চিয়ানিজ, ওনাইন্দিয়া, গোলমেশিন বার্থোলোমিউ ওগবেচে কেউই এ বারের দলে নেই। অথচ এঁরাই গত দুই মরশুমে ক্লাবকে সাফল্য এনে দিয়েছিলেন। তারকা মিডফিল্ডার জোয়াও ভিক্টর অবশ্য রয়েছেন এই দলে। যোগ দিয়েছেন মেক্সিকান ডিফেন্ডার অসওয়াল্দো এলানিস, ফিনল্যান্ডের জুহানা পেনানেন, ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড ফিলিপ দা সিলভা আমোরিম, কোস্তা রিকার ফরোয়ার্ড জোনাথন মোয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার ফরোয়ার্ড জোসেফ পল নোয়েলস। ভারতীয়দের মধ্যে এ মরশুমে যোগ দিয়েছেন ডিফেন্ডার বিগ্নেশ দক্ষিণামূর্তি এবং দুই মিডফিল্ডার মাকান চোথে ও লালচানহিমা সাইলো। এ ছাড়া গোলকিপার কাট্টিমণি, ডিফেন্ডার চিঙলেনসানা সিং, নিখিল পূজারি, নিম দোরজি,  মিডফিল্ডার আব্দুল রাবি, মহম্মদ ইয়াসিরও রয়েছেন এই দলে। কিন্তু কেউই ভাল ফর্মে নেই। হিতেশ শর্মা, জোনাথন মোয়া ও মহম্মদ ইয়াসির একটি করে গোল করেছেন। 

মোহনবাগান এসজি: মরশুমের শুরুতে ভারতীয় দলের হয়ে খেলতে গিয়ে চোট পেয়ে কার্যত সারা মরশুমের জন্যই ছিটকে গিয়েছেন আশিক কুরুনিয়ান। আশিকের পর চোট পেয়ে যান আনোয়ার আলি। তাঁর মাঠে ফেরাও অনিশ্চিত। যিনি ক্রমশ ফর্মে ফিরছিলেন, সেই মনবীর সিংও চোট পেয়ে ছিটকে যান। অস্ট্রেলীয় স্ট্রাইকার পেট্রাটসও চোটের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। সব মিলিয়ে প্রথম দলের চারজন ফুটবলারকে সম্ভবত পাচ্ছে না মোহনবাগান। এ ছাড়া জেসন কামিংস, আরমান্দো সাদিকুরা দলকে সেইভাবে সাহায্য করতে পারছেন না। লিস্টন কোলাসোর ফারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা নেই। সহাল আব্দুল সামাদ সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। তিনি কোনও কোনও ম্যাচে জ্বলে উঠলেও বেশির ভাগ ম্যাচেই নিষ্প্রভ থাকছেন। আনোয়ার আলির অনুপস্থিতিতে দলের রক্ষণ অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছে। ব্রেন্ডান হ্যামিল, হেক্টর ইউস্তেরাও ভাল ফর্মে নেই। ফলে দলকে গোলও হজম করতে হচ্ছে অনেক। এই অবস্থায় রক্ষণে শুভাশিস বোস, আশিস রাই, মাঝমাঠে হুগো বুমৌস, গ্ল্যান মার্টিন্স, অনিরুদ্ধ থাপা, লিস্টন কোলাসো, সহাল আব্দুল সামাদ ও আক্রমণে আরমান্দো সাদিকু, কিয়ান নাসিরি, সুহেল ভাট, জেসন কামিংসদের ওপর ভরসা করা ছাড়া উপায় নেই। 

দ্বৈরথের ইতিহাস

ইন্ডিয়ান সুপার লিগে দুই দল মুখোমুখি হয়েছে দশ বার। দু’টিতে জিতেছে হায়দরাবাদ এফসি। তিনটিতে মোহনবাগান এসজি ও বাকি পাঁচটি ম্যাচ ড্র হয়েছে। গত দুই মরশুমে দুই দলই সেমিফাইনালে ওঠায় তাদের মধ্যে চারবার করে দেখা হয়। গত মরশুমে দুটি প্লে অফই গোলশূন্য থাকে। শেষ পর্যন্ত টাই ব্রেকারে জিতে ফাইনালে ওঠে কলকাতার দল। লিগপর্বে প্রথমে মোহনবাগান ও পরে হায়দরাবাদ জেতে। দুই ম্যাচেই ফল হয় ১-০।  ২০২১-২২ মরশুমে প্রথম লেগে ২-২ হওয়ার পর দ্বিতীয় লেগে ২-১-এ জেতে মোহনবাগান। সেমিফাইনালে প্রথমে হায়দরাবাদ ৩-১-এ জিতে অনেকটা এগিয়ে যায়। ফলে ফিরতি সেমিফাইনালে মোহনবাগান ১-০-য় জিতেও ফাইনালে উঠতে পারেনি। সেই হারের বদলা তারা গত মরশুমে নিয়ে নেয়। ২০২০-২১-এ প্রথমে ১-১ হয় ও পরে ২-২ হয়।  

পরিসংখ্যান যা বলছে  

আইএসএলে হায়দরাবাদ এফসি-র বিরুদ্ধে গত তিন ম্যাচে কোনও  গোল করতে পারেনি মোহনবাগান এসজি। আর কোনও দলের বিরুদ্ধে তাদের এমন গোলখরা নেই। প্রথম দুটি অ্যাওয়ে ম্যাচে তারা ছ’গোল করে তিন গোল খেয়েছে। মোহনবাগানের খেলোয়াড়রা এরিয়াল বল দখলের লড়াইয়ে ৬০ শতাংশ (৯৪টির মধ্যে ৫৬টি) সাফল্য পেয়েছে। আর কোনও দল এক্ষেত্রে এত সাফল্য পায়নি। লিস্টন কোলাসো চারটি ম্যাচে ৩৪ বার বল দখলের ডুয়ালে সাফল্য পেয়েছেন, অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে গড়ে ৮.৫ টি করে লড়াই জিতেছেন তিনি। অন্য সব দলের সব খেলোয়াড়দের এই সংক্রান্ত তালিকায় তিনি দ্বিতীয় সেরা। এক নম্বরে চেন্নাইনের অজিত কুমার (৯)। পাসিং অ্যাকিউরেসি বা নিখুঁত পাস দেওয়ার ক্ষেত্রে সবার ওপরে মোহনবাগানের ব্রেন্ডান হ্যামিল। এ পর্যন্ত ৮৮.৮% পাস নিখুঁত দিয়েছেন তিনি। এ মরশুমে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি থ্রু পাস বাড়িয়েছেন মোহনবাগানের সহাল আব্দুল সামাদ।    

চলতি আইএসএলে প্রথম সাত ম্যাচে মাত্র চার গোল করেছে হায়দরাবাদ এফসি। লিগের ইতিহাসে প্রথম সাত ম্যাচে এত কম গোল করেনি তারা। প্রথম সাত ম্যাচে কোনও জয় নেই, এমন ঘটনাও তাদের আইএসএল ইতিহাসে প্রথম। পাসিং অ্যাকিউরেসিতে হায়দরাবাদের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার চিঙলেনসানা অন্য দলের সব ভারতীয়ের চেয়ে এগিয়ে। তাঁর পাসিং অ্যাকিউরেসি ৮৮.৬%। দেশি-বিদেশী মিলিয়ে তিনি দ্বিতীয় স্থানে। 

ম্যাচ- হায়দরাবাদ এফসি বনাম মোহনবাগান এসজি 

ভেনু- কলিঙ্গ স্টেডিয়াম, ভুবনেশ্বর 

সময়- ২ ডিসেম্বর, ২০২৩, শনিবার, রাত ৮টা 

সরাসরি সম্প্রচার ও স্ট্রিমিং 

টিভি চ্যানেল: ডিডি বাংলা ও কালার্স বাংলা সিনেমা- বাংলা, স্পোর্টস ১৮ খেল- হিন্দি, স্পোর্টস ১৮ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ, ভিএইচ ১ এসডি ও এইচডি- ইংলিশ।

অ্যাপ: জিও সিনেমা ও ওয়ানফুটবল।