ফাইনালে দুর্দান্ত জয় এটিকে এফসি-র, তৃতীয়বার হিরো আইএসএল ট্রফি আসছে কলকাতায়

অসাধারণ ফুটবল খেলে তৃতীয়বারের জন্য হিরো আইএসএলে সেরার শিরোপা জিতে নিল কলকাতার এটিকে এফসি। শনিবার গোয়ায় তারা দু’বারের সেরা চেন্নাইন এফসি-কে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নের খেতাব জিতে নিল। গত দুই মরশুমে সেরা চারে উঠতে পারেনি তারা। এ বার স্প্যানিশ কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস দলের দায়িত্ব নিয়েই গোটা দলটার চেহারা পাল্টে দেন এবং আরও একবার এটিকে-কে দেশের সেরা ফুটবল ক্লাবের খেতাব এনে দিলেন।

২০১৪-য় প্রথম হিরো আইএসএলে তাঁর কোচিংয়েই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল কলকাতার দলটি। তার ছ’বছর পরে ফের তাঁর জাদুর ছোঁয়াতেই এল চ্যাম্পিয়নের খেতাব। মাঝখানে ২০১৬-তেও সেরার শিরোপা পেয়েছিল তারা। এ বারেরটা সম্ভবত সেরা হয়ে থাকবে। কারণ, সারা লিগে দাপটের সঙ্গে খেলে চ্যাম্পিয়ন হল তারা। একবারের জন্যও সেরা চারের বাইরে বেরোয়নি তারা।

শনিবার তাদের সেরা তারকা রয় কৃষ্ণাকে ছাড়াই ৫০ মিনিট খেলতে হয় এটিকে এফসি-কে। ঊরুর পেশীতে টান ধরায় ফিজির এই অলিম্পিয়ান ও ১৫ গোলের মালিককে মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে হয়। তবে অসাধারণ দু’টি গোল করেছেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার হাভিয়ে হার্নান্ডেজ। প্রথম ও শেষেরটা। মাঝখানের গোলটা করেন এডু গার্সিয়া। তবে এ দিন দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন এটিকে-র গোলকিপার অরিন্দম ভট্টাচার্য। বেশ কয়েকটি অবধারিত গোল বাঁচিয়ে তিনি এ দিন দলকে চ্যাম্পিয়ন হতে দারুণ ভাবে সাহায্য করেন।     

  • প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চেন্নাই দুগোলে এগিয়ে যেতে পারত। ক্রিভেলারোর শট গোল লাইনের সামনে সেভ করেন প্রীতম। পরে ভাল্সকিস গোলের সামনে থেকে ক্রস বারে মারেন তিনি।
  • দশ মিনিটের মাথায় বাঁ দিক থেকে রয় কৃষ্ণার ক্রস নিয়ে হাফ ভলি মেরে গোল করেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার হাভিয়ে হার্নান্ডেজ।
  • রয় কৃষ্ণার বাঁপায়ের ঊরুর পেশীতে টান ধরায় ৪০ মিনিটের মাথায় মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি।
  • ৪৭ মিনিটের মাথায় উইলিয়ামসের ক্রস থেকে বল পেয়ে বক্সের মধ্যে গোলের বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয় পোস্টে চমৎকার ফিনিশ করেন এডু গার্সিয়া
  • ৬৯ মিনিটে জেরির পাস থেকে ভাল্সকিস সোজা ও জোরালো শটে এটিকে-র জালে বল জড়িয়ে দেন।
  • স্টপেজ টাইমের একেবারে শেষ মুহূর্তে ডান দিক দিয়ে পাল্টা আক্রমণে উঠে শেষ গোলটা করে ফেলেন হাভিয়ে হার্নান্ডেজ।

শনিবার গোয়ার ফতোরদায় দর্শকহীন জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে প্রথম পাঁচ মিনিটের মধ্যেই চেন্নাইন অবশ্য দু’গোলে এগিয়ে যেতে পারত। প্রথম মিনিট পূ্র্ণ হওয়ার আগেই রাফায়েল ক্রিভেলারোর শট গোল লাইনের সামনে সেভ করেন প্রীতম কোটাল। পঞ্চম মিনিটে বক্সের মধ্যেই অবিশ্বাস্য ভুল করেন নেরিজাস ভাল্সকিস, যিনি শেষ ১৫টি ম্যাচে ১৪টি গোল করেছেন। গোলের সামনে থেকে ক্রস বারে মারেন তিনি।

তাই শুরু থেকেই মনে হচ্ছিল চ্যাম্পিয়ন্স লাক হয়তো এটিকে-র সঙ্গেই রয়েছে। দশ মিনিটের মধ্যেই সেটা প্রমাণও করে দেয় কলকাতার দল। বাঁ দিক থেকে রয় কৃষ্ণার ক্রস নিয়ে হাফ ভলি মেরে গোল করেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার হাভিয়ে হার্নান্ডেজ। এটিই ৩০ বছর বয়সি এই মিডফিল্ডারের এই লিগে প্রথম গোল। এর আগে পাঁচটি গোলে সাহায্য করলেও নিজে একটিও পাননি তিনি। সেই খরা কাটল এত দিনে।

অসাধারণ পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফসল এই গোল। কৃষ্ণা ও হাভির মাঝখানে ডেভিড উইলিয়ামস থাকলেও তিনি বলটা ছেড়ে দিয়ে একটা ডামি দেন দেন হার্নান্ডেজের জন্য। এবং তাতেই ধোঁকা খেয়ে যান চেন্নাইনের ডিফেন্ডাররা।

প্রথম পাঁচ মিনিটের ধাক্কা সামলে এটিকে তার পর থেকেই খেলায় ফেরে।  ২৪ মিনিটের মাথায় ফের সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল এটিকে। পরপর তিনবার গোল সেভ করে চেন্নাইন। ডান দিকের উইং দিয়ে ওঠা রয় কৃষ্ণার শট প্রথমে সেভ করেন গোলকিপার বিশাল কয়েথ। বল ছিটকে যায় হার্নান্ডেজের দিকে। তিনিও গোলে শট নেন, কিন্তু এ বার লালদিনলিয়ানা রেন্থলেই সেই শট আটকে দেন।

এই সময়ের পর থেকে চাপ বাড়ায় চেন্নাইন এফসি। ভাল্সকিস ২৭ মিনিটের মাথায় ফের অরিন্দমের হাতে বল জমা করে দেন অদ্ভূত ভাবে। তার দু’মিনিট পরে ফের ভাল্সকিসের শট দুর্দান্ত ভাবে বাঁচিয়ে দেন অরিন্দম। ৩১ মিনিটের মাথায় ফ্রি-কিক থেকে পাওয়া বলে আন্দ্রে শেমব্রি শট নিয়েছিলেন গোলে। তাও ডাইভ মেরে বল বিপদসীমার বাইরে দেন অরিন্দম। এই সময়ে মারাত্মক চাপে পড়ে যান এটিকে-র গোলকিপার এবং তিনি কিন্তু দুর্দান্ত ভাবে চাপটা সামলে নেন তিনি।

চেন্নাই চাপ বাড়ানোয় এটিকে-র মাঝমাঠ আগোছালো হয়ে যাচ্ছিল। প্রথমার্ধের শেষ দিকে আরও একটা ধাক্কা লাগে এটিকে শিবিরে। অধিনায়ক রয় কৃষ্ণার বাঁ পায়ের ঊরুর পেশীতে টান ধরে যায় এবং ৪০ মিনিটের মাথায় মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে বাধ্য হন তিনি। বেরিয়ে যাওয়ার পরে কান্নায় ভেঙে পড়তে দেখা যায় তাঁকে। কৃষ্ণার জায়গায় নামেন স্প্যানিশ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ম্যান্ডি সোসা পেনা। হয়তো প্রতিপক্ষ ক্রমশ চাপ বাড়াচ্ছে দেখে রক্ষণে শক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশেই তাঁকে নামানোর সিদ্ধান্ত নেন কোচ হাবাস।    

রয় কৃষ্ণা মাঠে না থাকার প্রতিফলন প্রথমার্ধের শেষ ৮-৯ মিনিটেই দেখা যায়। হঠাৎ করে পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসায় সেটা মানিয়ে নিতে বেশ অসুবিধা হচ্ছিল কলকাতার দলের ফুটবলারদের। এই দুর্বলতাকেই কাজে লাগিয়ে চেন্নাইন দ্বিতীয়ার্ধে খেলায় ফিরে আসবে কি না, এই প্রশ্ন নিয়েই বিরতিতে যান দুই দলের ফুটবলাররা।

তবে এটিকে শিবিরের সেই দুশ্চিন্তা দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দূর করে দেন ডেভিড উইলিয়ামস ও এডু গার্সিয়া জুটি।  ৪৭ মিনিটের মাথায় উইলিয়ামসের ক্রস থেকে বল পেয়ে বক্সের মধ্যে গোলের বাঁ দিক থেকে দ্বিতীয় পোস্টে চমৎকার ফিনিশ করেন এডু গার্সিয়া এবং দলকে ২-০-য় এগিয়ে দেন। ম্যাচের বাকি সময়ে চেন্নাইনের গোলের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেন তাঁরা।

দুই গোলে পিছিয়ে যাওয়ার পরেই পজেশন বাড়িয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা শুরু করে চেন্নাইন। তবে যতবার তারা আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করছিলেন, ততবারই নিজেদের গোলের সামনে লোক বাড়িয়ে তাদের আটকে দিচ্ছিলেন প্রীতম, সোসা পেনা-রা।

কাউন্টার অ্যাটাকে যাওয়ার চেষ্টাও করে এটিকে প্রবীর দাস নিজে ডান দিক দিয়ে উঠে একবার গোলে শট নেন। কিন্তু বিপক্ষের গোলকিপার তা বাঁচিয়ে নেন। ৬৬ মিনিটের মাথায় প্রণয় হালদার নামেন মাইকেল রেজিনের জায়গায়। রক্ষণের শক্তি আরও বাড়ানোর জন্য এই পরিবর্তন।

কিন্তু যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই পরিবর্তনটা করেন হাবাস, সেটা ব্যর্থ করে দেন ভাল্সকিস ৬৯ মিনিটের মাথায় গোল করে। এটিকে রক্ষণের ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নিয়ে এই গোলটি করে ফেলেন ভাল্সকিস। অনিরুদ্ধ থাপার সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে রেন্থলেই বক্সের মধ্যে ক্রস বাড়ান। কিন্তু প্রীতমের মাথার পিছনে লেগে বল ফের আসে জেরি লালরিনজুয়ালার কাছে। জেরি বল দেন ভাল্সকিসকে ও তিনি সোজা গোলে শট নেন।

এটিকে এফসি-র দিশাহারা অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে পরের মিনিটেই প্রায় সমতা এনে ফেলেছিল চেন্নাইন। এ বারও ভাল্সকিস হেড করেছিললেন গোলে। কিন্তু এ বার বাঁচিয়ে দেন অরিন্দম। এর আগে বহু ম্যাচের মতোই অরিন্দম এ দিন একা দায়িত্ব নিয়ে দলের অবধারিত হার বাঁচান। ৭৩ মিনিটের মাথায় মাইকেল সুসাইরাজ বক্সের মধ্যে বল রেখেছিলেন, যা থেকে দুরপাল্লার শট নিয়েছিলেন হার্নান্ডেজ। কিন্তু তা বারের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়।

শেষের দিকে চেন্নাইন এফসি আরও চাপ  বাড়ানোর চেষ্টা করে। ভাল্সকিস ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। ৮২ মিনিটের মাথায় গোলের সামনে থেকে তিনি হেড করলেও তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কৃষ্ণার বদলে যাঁকে নামানো হয়েছিল, সেই সোসা পেনা চোট পেয়ে যাওয়ায় তাঁকেও তুলে নেন হাবাস ও ৮৪ মিনিটের মাথায় নামান স্প্যানিশ ডিফেন্ডার ভিক্টর মনজিলকে। এবং তার পরেই গোলের সামনে প্রায় দেওয়াল তুলে দেয় এটিকে এফসি।

কিন্তু কাউন্টার অ্যাটাক বন্ধ করেনি তারা। এমনই পাল্টা আক্রমণে স্টপেজ টাইমের একেবারে শেষ মুহূর্তে ডান দিক দিয়ে উঠে শেষ গোলটা করে ফেলেন হাভিয়ে হার্নান্ডেজ। ওই গোলের পরে আর চেন্নাইনের ম্যাচে ফেরার কোনও সম্ভাবনাই ছিল না।

Your Comments

Your Comments