ইগর স্টিমাচের ডাকে ভারতের সম্ভাব্য দলে বাংলার ছয়

ভারতীয় ফুটবল দলের প্রধান কোচ ইগর স্টিমাচ আসন্ন দুটি ফ্রেন্ডলি ম্যাচের জন্য ৩৫ জনের যে প্রাথমিক দল ঘোষণা করেছেন, তার মধ্যে কলকাতার দুই প্রধানের পাঁচজন ও একজন বাঙালি ফুটবলার রয়েছেন। বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে যা অবশ্যই ভাল খবর।

মূলত চলতি হিরো আইএসএলে তাঁদের পারফরম্যান্স দেখেই স্টিমাচ তাঁর দলে এই খেলোয়াড়দের ডেকেছেন। ১৩ মার্চ ফাইনালের পরে এই ৩৫ জনের মধ্যে থেকে ২৮ জনের স্কোয়াড বেছে নেবেন ইউক্রেনিয়ান স্টিমাচ। এই দল নিয়েই তিনি দুবাইয়ে মার্চের শেষ সপ্তাহে দু’টি ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলবেন। প্রথমটি ওমানের বিরুদ্ধে ২৫ মার্চ ও দ্বিতীয়টি সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর বিরুদ্ধে ২৯ মার্চ।

দল ঘোষণা করে স্টিমাচ বলেন, “এই মরশুমটা বেশ কঠিন কেটেছে। ফুটবলাররা নিশ্চয়ই সবাই বেশ ক্লান্ত। তবে ক্লান্তি কাটানোর জন্য ওরা অনেক সময়ই পাবে। অনেকেই দু’সপ্তাহ সম্পুর্ণ বিশ্রাম পাবে। ভারতীয় দলের শিবিরে যোগ দেওয়ার আগে তাদের কোনও ট্রেনিং সেশন করতে হবে না এই বিশ্রামে। একটা খারাপ বছর পরে ফের সবাই এক জায়গায় মিলিত হতে পারাটা আনন্দের ব্যাপার। কয়েকজন তরুণ প্রতিভার সঙ্গে দেখা করতে পারব, যাদের মধ্যে ভবিষ্যতের তারকা হয়ে ওঠার উপাদান রয়েছে”।

বাংলার দুই ক্লাব ও বাংলা থেকে যাঁরা স্টিমাচের ডাক পেয়েছেন, এই প্রতিবেদনে তাঁদের সম্পর্কে একে একে কিছু জেনে নেওয়া যাক।

প্রীতম কোটাল, ডিফেন্ডার, এটিকে মোহনবাগান

এটিকে মোহনবাগানের সাইড ব্যাক ও অন্যতম অধিনায়ক দলের রক্ষণের অন্যতম ভরসা। সবুজ-মেরুন জার্সি গায়ে চলতি হিরো আইএসএলে নিয়মিত খেলছেন ও বিপক্ষের অ্যাটাকারদের আটকানোর ভূমিকায় তিনি যথেষ্ট দায়িত্ববান। ২০১৫-র মার্চে ভারতীয় দলের হয়ে প্রথম খেলেন প্রীতম। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে নেপালের বিরুদ্ধে ম্যাচে তাঁর অভিষেক। সেই ম্যাচে ভারত ২-০ গোলে জেতে। ২০১৬-র জানুয়ারিতে আফগানিস্তানকে হারিয়ে ভারতের যে দল সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে, সেই দলে প্রীতম ছিলেন অন্যতম সদস্য। তার পর থেকে তিনি নিয়মিত ভারতীয় দলের হয়ে খেলছেন ও দেশের জার্সি গায়ে ৩৫টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি।

চলতি হিরো আইএসএলে তিনি একটি বাদ দিয়ে দলের সব ম্যাচে খেলেছেন। তাঁর পাসিং অ্যাকিউরেসি ৬৫ শতাংশের বেশি। ৬৬টি ট্যাকল, ৩৯টি ইন্টারসেপশন, ৬৭টি ক্লিয়ারেন্স ও ২৯টি ব্লক করেছেন এ পর্যন্ত। বিপক্ষের গোল এরিয়ায় গিয়ে একটি গোলও করে এসেছেন তিনি। তাই প্রীতমকে শিবিরে না ডেকে পারেননি জাতীয় কোচ।

প্রবীর দাস, ডিফেন্ডার, এটিকে মোহনবাগান

হিরো আইএসএলের গত মরশুমে স্বপ্নের পারফরম্যান্স দেখিয়েছিলেন প্রবীর দাস। এটিকে-র জার্সি গায়ে সকলের নজর কেড়ে নিয়েছিলেন তিনি। তাঁর জন্য গর্বে বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের বুক ফুলে উঠেছিল। কারণ, অনেক দিন পরে বাংলার এক ফুটবলার এ দেশের ফুটবলে তারকার সম্মান অর্জন করে নিয়েছিলেন। এটিকে-র কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস তাঁকে রাইট উইং ব্যাক হিসেবে খেলিয়ে দারুন কার্যকরী করে তোলেন। এবং এই ভূমিকায় দারুন সফলও হন তিনি। নিজেদের সীমানা বা মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে ডান উইং দিয়ে উঠে বিপক্ষের গোল এরিয়ায় প্রবীর বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন বারবার। অসাধারণ ও নিখুঁত কিছু ক্রস ও পাস করেছেন তিনি, যা শেষ পর্যন্ত গোলে পরিণত হয়েছে। পাঁচটি অ্যাসিস্ট ছিল তাঁর সে বার। ডিফেন্ডার হিসেবেও ছিলেন সফল ৮৫টি ক্লিয়ারেন্স ছিল তাঁর। ফুটবল জীবনের সেরা মরশুম তাঁর ছিল ওটাই।

এ বার সেই ভূমিকায় তাঁকে বেশি দেখা যায়নি এটিকে মোহনবাগান কোচ হাবাস তাঁকে নিয়মিত না খেলানোয়। যে সুযোগগুলি পেয়েছেন প্রবীর, সেগুলোও ঠিকমতো কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। তবে লিগের শেষ ম্যাচে সেই চেনা প্রবীরকে দেখা যায়। পরিবর্ত হিসেবে নেমে ৭১ মিনিটে মাঠে ছিলেন তিনি। একটি গোলের সুযোগ তৈরি করেন। দু’টি ভাল ক্রসও করেন, যেগুলো থেকে গোল হতে পারত। সম্ভবত আগেরবারের ও সে দিনের পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই তাঁকে ভারতীয় শিবিরে ডেকেছেন স্টিমাচ। ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ ও ২৩ দলের হয়ে খেললেও এখনও সিনিয়র দলের জার্সি তাঁর গায়ে ওঠেনি। এ বার সেই লক্ষ্যে দৌড় শুরু করবেন তিনি।     

সন্দেশ ঝিঙ্গন, ডিফেন্ডার, এটিকে মোহনবাগান

ভারতীয় দলের নিয়মিত সেন্টার ব্যাক এই মরশুমের আগেই যোগ দিয়েছেন এটিকে মোহনবাগানে। খেলছেনও যথেষ্ট সাফল্যের সঙ্গেই। গত বছর অর্জুন সম্মান পেয়েছেন তিনি। ২০১৪ থেকে গত বছর পর্যন্ত টানা কেরালা ব্লাস্টার্সের হয়ে খেলার পরে এ বছর রেকর্ড পারিশ্রমিকে এটিকে মোহনবাগান শিবিরে সই করেছেন চণ্ডীগড়ের এই ফুটবলার। এ বছর হাবাস তাঁকে প্রতি ম্যাচে খেলিয়েছেন। কিন্তু শেষ ম্যাচে হ্যামস্ট্রিং পুল হওয়ায় মাঠ ছাড়তে হয় তাঁকে। সেমিফাইনালে খেলতে পারবেন কি না, তা নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ১০৮টি ক্লিয়ারেন্স রয়েছে তাঁর। ২৩টি ইন্টারসেপশন। ৩৯টি ব্লক ও ৪৮টি ট্যাকল জমা হয়েছে তাঁর খাতায়। ২০১৫-য় নেপালের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে অভিষেক হয় তাঁর। ২০১৭-য় ভারতীয় দলের অধিনায়কের আর্ম ব্যান্ড তাঁর হাতে তুলে দেন তৎকালীন কোচ স্টিফেন কনস্টানটাইন। ভারতীয় দলের হয়ে সব মিলিয়ে ৩৬টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। ২০১৯-এর সেপ্টেম্বরে কাতারের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের ম্যাচে শেষ ভারতের হয়ে মাঠে নামেন তিনি। সেই ম্যাচ গোলশূন্য ড্র হয়। এর পরেই তাঁর এসিএল ইনজুরি হয় ও ছ’মাসের জন্য মাঠের বাইরে চলে যান। চোট সারিয়ে এ বারের হিরো আইএসএলে ফিরে আসেন।

মনবীর সিং, ফরোয়ার্ড, এটিকে মোহনবাগান

ভারতীয় ফুটবল বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই মুহূর্তে ভারতের সেরা ফরোয়ার্ডদের মধ্যে সুনীল ছেত্রীর পরেই মনবীরকে রাখা যায়। এ বারের হিরো আইএসএলে তাঁর পারফরম্যান্সও বেশ ভাল। মোট পাঁচটি গোল করেছেন, যার মধ্যে একাধিক গোল বিশ্বমানের। উইং দিয়ে উঠে কোণাকুণি শটে কয়েকটি গোল তিনি করেছেন এ বারের লিগে, যা ফুটবলপ্রেমীদের নজর কেড়েছে। নজর কেড়েছে ভারতীয় কোচ ইগর স্টিমাচেরও। সেই কারণেই ৩৫ জনের মধ্যে যে তিন ফরোয়ার্ড জায়গা পেয়েছেন, তাঁদের একজন হলেন মনবীর। পঞ্জাবের জলন্ধর থেকে উঠে আসা এই ফরোয়ার্ড মূলত উইং দিয়ে আক্রমণে ওঠেন। এ পর্যন্ত হিরো আইএসএলে ২০ ম্যাচে পাঁচটি গোল করেছেন তিনি। সঙ্গে তিনটি অ্যাসিস্টও করেছেন। শট নিয়েছেন ২৭টি, ক্রস দিয়েছেন ৩৩টি। রয় কৃষ্ণা, ডেভিড উইলিয়ামসদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে যাচ্ছেন তিনি। ২০১৭-র অগাস্টে মরিশাসের বিরুদ্ধে পরিবর্ত হিসেবে প্রথম ভারতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামেন তিনি। ২০১৮-র সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারতীয় দলের হয়ে খেলেন তিনি। মালদ্বীপের বিরুদ্ধে প্রথম আন্তর্জাতিক গোল করেন তিনি। সেই টুর্নামেন্টে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আরও দুটি গোল করেন মনবীর। এ বার ফের দেশের হয়ে খেলার সুযোগ এসেছে তাঁর সামনে। তবে সে জন্য তাঁকে হিরো আইএসএল সেমিফাইনালে সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে হবে।

সার্থক গলুই, ডিফেন্ডার, এসসি ইস্টবেঙ্গল

চলতি লিগে মুম্বই  সিটি এফসি থেকে লিয়েনে এসসি ইস্টবেঙ্গলে আসার পরে সার্থক বেশ ভাল পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন। ৯টি ম্যাচে ৪১টি ক্লিয়ারেন্স রয়েছে তাঁর। তাঁর ভুলে একটি আত্মঘাতী গোল হয়ে গেলেও সেই ম্যাচেই গোল করে তার প্রায়শ্চিত্ত করেন সার্থক। যদিও তাতে দলকে জেতাতে পারেননি। এসসি ইস্টবেঙ্গল এ বারে তেমন সাফল্য না পেলেও সার্থক কিন্তু যথেষ্ট ভাল পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন এবং রক্ষণে যথেষ্ট দায়িত্ব সহকারে নিজের ভূমিকা পালন করেছেন। সম্ভবত সেই কারণেই ভারতের প্রাথমিক দলে ডাক পেয়েছেন তিনি। অনূর্ধ্ব ১৬ ও ১৯ দলের পরে সার্থক সিনিয়র দলের প্রতিনিধিত্বও করেন ২০১৭-য়। এ বার ফের তাঁর সামনে সুযোগ।

শুভাশিস রায়চৌধুরি, গোলকিপার, নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি

নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-র হিরো আইএসএল সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে এই বঙ্গসন্তানের অবদান যথেষ্ট। ১৭টি গোল খেলেও সেভ করেছেন ২১টি। এর মধ্যে হার বাঁচানো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভও রয়েছে। তাঁর সেভ পার্সেন্টেজ ৫৫ শতাংশ। ক্লিন শিট রাখতে পেরেছেন তিনবার। এটিকে, দিল্লি ডায়নামোজ, এফসি গোয়া, কেরালা ব্লাস্টার্স ও জামশেদপুর এফসি-র পর এবার তিনি যোগ দিয়েছেন নর্থইস্ট ইউনাইটেডে। হিরো আইেসএলে সব মিলিয়ে ৫১টি ম্যাচ খেলা হয়ে গিয়েছে তাঁর। ১৪৫টি সেভ করেছেন। ২০১৪-র চ্যাম্পিয়ন এটিকে দলের গোলকিপার ছিলেন তিনি। কিন্তু মাঝপথেই চোটের জন্য মাঠের বাইরে চলে যান। হিরো আইএসএলের সবকটি মরশুমেই খেলেছেন তিনি।   

Your Comments

Your Comments