জামশেদপুরের বিরুদ্ধে হয়তো ভারতীয় একাদশ নিয়ে লড়াই এসসি ইস্টবেঙ্গলের

প্রথম লেগে একবারও জয়ের স্বাদ পায়নি তারা। দ্বিতীয় লেগে নিশ্চয়ই সেই স্বাদ পাবে, এমনই আশা নিয়ে দ্বিতীয় পর্বের অভিযান শুরু করতে চলেছে এসসি ইস্টবেঙ্গল। মঙ্গলবার সেই অভিযানের শুরুতেই প্রতিপক্ষ জামশেদপুর এফসি। প্রথম লেগের সূচনাও তারা করেছিল ইস্পাতনগরীর দলের বিরুদ্ধেই। ১-১ ড্র দিয়ে শুরু করে তারা। কিন্তু তার পরে দুই দলের পথ দুই দিকে বেঁকে গিয়েছে। কলকাতার দল ছ’টি ড্র ও চারটি হার নিয়ে থেকে গিয়েছে এগারো নম্বরেই। জামশেদপুর চারটি জয়, চারটি ড্র ও মাত্র দু’টি হার নিয়ে রয়েছে সেরা চারের মধ্যেই।

প্রথম লেগের ম্যাচে দুই দল যে অবস্থায় ছিল, এই ম্যাচে তাদের অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। এর মধ্যে ১৭টি গোল করা হয়ে গিয়েছে আওয়েন কোইলের দলের। কিন্তু এসসি ইস্টবেঙ্গলের ১১টির বেশি গোল নেই। এখন পর্যন্ত একমাত্র জয়হীন দল তারাই। কিন্তু গত তিন ম্যাচে যে খেলা দেখিয়েছে লাল-হলুদ বাহিনী, তাতে শুধু ধারালো আক্রমণ ছিল না। বাকি প্রায় সব কিছুই ছিল বলা যায়। ধারালো আক্রমণ না থাকা সত্ত্বেও এই তিনটির মধ্যে দু’টি ম্যাচে দু’টি গোলও করে তারা। কিন্তু গত ম্যাচে চলতি লিগের সবচেয়ে আক্রমণাত্মক দল মুম্বই সিটি এফসি-কে যে ভাবে আটকে রেখে হতাশ করে তোলে অন্তর্বর্তী কোচ রেনেডি সিংয়ের প্রশিক্ষণাধীন দল, তাতে এটাই স্পষ্ট যে দু-একজন ভাল গোল করার লোক পেলে তারা জয়ের স্বাদ পেতেই পারে।

ভরসা জোগাচ্ছে রক্ষণ

ভাল খবর যে, গত তিন ম্যাচে তাদের রক্ষণ যথেষ্ট উন্নতি করেছে। গত ম্যাচে মুম্বই সিটি এফসি-কে দুটির বেশি গোলে শট নিতে দেয়নি তারা। তার আগে বেঙ্গালুরু এফসি-র ক্ষেত্রেও তা-ই হয়। হায়দরাবাদ অবশ্য ছ’টি গোলমুখী শট নিয়ে মাত্র একটি গোল করতে পারে। শেষ পাঁচ মিনিটে জয়ের গোল তুলে নিতে মরিয়া হয়ে ওঠে হায়দরাবাদ। তবে এসসি ইস্টবেঙ্গলের আঁটোসাঁটো রক্ষণ তাদের কাঙ্খিত জয় থেকে দূরেই রাখে। গত শুক্রবার সবচেয়ে বেশি গোল দেওয়া দলের আক্রমণ বিভাগকে দুর্দান্ত ভাবে ঠেকিয়ে রাখে লাল-হলুদ রক্ষণ। প্রথমবার ‘ক্লিন শিট’ রেখে মাঠ ছাড়ার জন্য যে পাল্টা চ্যালেঞ্জ তারা ছুড়ে দেয় ২২ গোল করা মুম্বইয়ের আক্রমণ বিভাগকে, তার কোনও প্রশংসাই যথেষ্ট নয়। জয় অধরা থাকলেও রেনেডি সিংয়ের প্রশিক্ষণে যে ভাবে দলটা লড়াকু হয়ে উঠছে, তাতে তাদের প্রথম জয় সম্ভবত খুব দেরি নেই।  কিন্তু জেতার জন্য যে গোল দরকার, তা করার লোকেরই অভাব তাদের। 

পরিসংখ্যানও বলছে, রেনেডি দায়িত্ব নেওয়ার পরে এসসি ইস্টবেঙ্গলের প্রতিপক্ষদের কাজ অনেক কঠিন হয়েছে। প্রথম সাত ম্যাচে যেখানে প্রতি ম্যাচে গড়ে দশটি করে গোলমুখী শট নিয়েছে লাল-হলুদের প্রতিপক্ষরা, সেখানে শেষ তিন ম্যাচে বক্সের মধ্যে থেকে তাদের বিরুদ্ধে গোলমুখী শটের সংখ্যা গড়ে ৫.৬৬। সেট পিসেও এসসি ইস্টবেঙ্গল যথেষ্ট ভাল জায়গায় রয়েছে। তাদের মোট গোলের ৮১.৮১% এসেছে সেট পিস থেকে, যা অন্যান্য দলের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। জামশেদপুরের সেটপিস গোলের শতকরা হিসাব ৫৮.৮%। মঙ্গলবারের ম্যাচেও এসসি ইস্টবেঙ্গলকে সেই সেট পিসই জেতাতে পারে কি না, সেটাই দেখার। তবে যাঁরা তাদের বেশির ভাগ সেট পিস গোলের নায়ক, সেই পেরোসেভিচ ও দার্ভিসেভিচ, কাউকেই হয়তো এই ম্যাচে পাওয়া যাবে না। সুতরাং খুব কষ্ট করেই মঙ্গলবার ম্যাচটা খেলতে হবে এসসি ইস্টবেঙ্গলকে।

ধারহীন আক্রমণ

ক্রেয়েশিয়ান ফরোয়ার্ড আন্তোনিও পেরোসেভিচ পাঁচ ম্যাচের সাসপেনশনে। নাইজেরিয়া থেকে আসা ফরোয়ার্ড ড্যানিয়েল চিমা এক রাশ ব্যর্থ নিয়ে দেশে ফিরে গিয়েছেন। বাকি চার বিদেশিরই চোট। তাই মঙ্গলবার এসসি ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণে কোনও বিদেশিকে দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। শুধু আক্রমণে কেন? প্রথম এগারোতেও কোনও বিদেশি না থাকলেও অবাক হবেন না। লাল-হলুদ শিবিরের অবস্থা এখন এ রকমই। সোমবার এক ব্রাজিলীয় স্ট্রাইকারের আগমনের খবর ঘোষণা করা হলেও এখনই তাঁর মাঠে নামা হচ্ছে না। গোয়ায় এসে কোয়ারান্টাইন পর্ব শেষ করে তাঁকে মাঠে দেখতে এখনও বেশ কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হবে সমর্থকদের। কিন্তু তত দিন গোল করবে কে? সেম্বয় হাওকিপ, বলওয়ান্ত সিংরাই এখন ভরসা।

রেনেডি জানেন আক্রমণে তাঁর শক্তি সীমিত। তাই যে জায়গায় আপাতত শক্তি রয়েছে তাঁদের, সেটার ওপরই বেশি জোর দিচ্ছেন তিনি। বাস্তবটাকে মেনে নিয়েই লড়াইটা চালিয়ে যেতে চান তিনি। নতুন হেড কোচ মারিও রিভেরা দলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে হয়তো এটাই তাঁর প্রশিক্ষণে শেষ ম্যাচ লাল-হলুদ বাহিনীর। তাই এই ম্যাচে চলতি লিগের প্রথম জয়টা অবশ্যই তুলে নিতে চাইবেন রেনেডি। কিন্তু সাধ থাকলেও সেই সাধ্য তাদের আছে কি না, সেটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

দুর্ধর্ষ ইস্পাতকঠিন দল

জামশেদপুরের দুর্ধর্ষ স্কটিশ ফরোয়ার্ড গ্রেগ স্টিউয়ার্ট, যিনি দলের ১৭টি গোলের মধ্যে পাঁচটি গোল করেছেন ও পাঁচটি গোল করিয়েছেন, তাঁকে সামলানো যেমন লাল-হলুদ রক্ষণের বড় চ্যালেঞ্জ, তেমনই ধুরন্ধর ডিফেন্ডার পিটার হার্টলেকে বোকা বানিয়ে গোলের মুখ খোলা আরও কঠিন চ্যালেঞ্জ তাদের পক্ষে।

তিন ম্যাচে জয়হীন থাকার পরে গত ম্যাচেই নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে জয়ে ফিরেছে জামশেদপুর এফসি। হিরো আইএসএলে তিনবারের মুখোমুখিতে এখন পর্যন্ত হারেনি এসসি ইস্টবেঙ্গল। গত মরশুমে প্রথম জয় তারা পেয়েছিল এই জামশেদপুরের বিরুদ্ধেই। এ বারও প্রথম জয়টা ইস্পাতনগরীর দলের বিরুদ্ধেই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে কি না, সেটাই দেখার।

নজরে যাঁরা

ধারাবাহিক ভাবে দলের রক্ষণের একটি দিক যথেষ্ট কড়া ভাবে আগলে রেখেছেন তিনি। ২৫ বছর বয়সি এই ডিফেন্ডারের খাতায় এ পর্যন্ত ২৯টি ট্যাকল, ২৩টি ইন্টারসেপশন, ৩৪টি ক্লিয়ারেন্স ও ২০টি ব্লক জমা হয়েছে। দুরন্ত ফর্মে থাকা এসসি ইস্টবেঙ্গলের সাইড ব্যাক হীরা মন্ডল নিজেকে এই লিগে নিজেকে যথেষ্ট প্রমাণ করেছেন। এই ম্যাচেও তিনি লাল-হলুদ ডিফেন্সের ভরসা। একাধিক ম্যাচে প্রশংসা করার মতো পারফরম্যান্স দেখিয়েছেন তিনি। একটি ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়র পুরস্কারও অর্জন করেছেন।

গোলকিপার অরিন্দম ভট্টাচার্য ক্রমশ সেরা ম্যাচফিটনেস ফিরে পাচ্ছেন। গত ম্যাচেই প্রথম ক্লিন শিট রেখে মাঠ ছেড়েছেন গতবারের গোল্ডেন গ্লাভ পুরস্কারজয়ী। এসসি ইস্টবেঙ্গলের সৌভাগ্য যে চোট সারিয়ে ক্রমে ছন্দে ফিরছেন অরিন্দম। চোট নিয়েই গোল লাইনে চলে আসায় তাঁর রিকভারিতে সময় লাগছে। তবে নিজের সেরা জায়গায় চলে এলে অনেকটা নিশ্চিন্ত হবে তাঁর দল। 

পাঁচ গোল করা ও পাঁচ গোল করানো স্কটিশ স্ট্রাইকার  গ্রেগ স্টিউয়ার্টই এখন জামশেদপুরের গোলমেশিন বলা যায়। দলের প্রতিটি জয়েই তাঁর অবদান রয়েছে। এই ম্যাচেও তিনি গোল পান কি না, সেটাই দেখার। গত ম্যাচের শেষ মুহূর্তে ঈশান পন্ডিতার জয়সূচক গোল সাড়া ফেলে দেয়। তিনি অবশ্য শেষের দিকে গোল পেতে রীতিমতো বিশেষজ্ঞ। দেশের সেরা লিগে তাঁর পাঁচটি গোলই এসেছে ৮০ মিনিটের পরে। এবং দলের প্রতিটি জয়েই তাঁর অবদান ছিল।

এসসি ইস্টবেঙ্গল স্কোয়াড

গোলকিপার: অরিন্দম ভট্টাচার্য, শুভম সেন, শঙ্কর রায়;

ডিফেন্ডার: আদিল খান, স্যারিনিও ফার্নান্ডেজ, রাজু গায়কোয়াড়, হীরা মন্ডল, জয়নার লরেন্সো, অঙ্কিত মুখার্জি, ড্যানিয়েল গোমস, গৌতম সিং, আকাশদীপ সিং, টমিস্লাভ মরচেলা ও ফ্রানিও পর্চে;

মিডফিল্ডার: অমরজিৎ সিং কিয়াম, জ্যাকিচন্দ সিং, রোমিও ফার্নান্ডেজ, সৌরভ দাস, সংপু সিঙসিট, লালরিনলিয়ানা হামতে, আঙ্গুসানা ওয়াহেংবাম, মহম্মদ রফিক, বিকাশ জায়রু, লোকেন মেতেই, আমির দার্ভিসেভিচ, ড্যারেন সিডোল;

ফরোয়ার্ড: নাওরেম মহেশ সিং, থঙখোসিম সেম্বয় হাওকিপ, বলওয়ন্ত সিং, সিদ্ধার্থ শোরোদকর, শুভ ঘোষ, ড্যানিয়েল চিমা চুকুউ, আন্তোনিও পেরোসেভিচ।     

ম্যাচ: জামশেদপুর এফসি বনাম এসসি ইস্টবেঙ্গল

তারিখ ও সময়: ১১ জানুয়ারি, সন্ধ্যা ৭.৩০

ভেনু: অ্যাথলেটিক স্টেডিয়াম, পানাজি

সম্প্রচার: স্টার স্পোর্টস ২, স্টার স্পোর্টস ২ এইচডি, স্টার স্পোর্টস ৩, স্টার স্পোর্টস ১ হিন্দি, স্টার স্পোর্টস ১ হিন্দি এইচডি, স্টার স্পোর্টস ১ বাংলা

অনলাইন স্ট্রিমিং: ডিজনি+হটস্টার ও জিও টিভি

Your Comments

Your Comments