এগারো গোলের ম্যাচে ওডিশা এফসি-র কাছে ৫-৬ হার এসসি ইস্টবেঙ্গলের

নতুন নজির সৃষ্টি হল হিরো ইন্ডিয়ান সুপার লিগে। সাত মরশুমে এই প্রথম কোনও একটি ম্যাচে হল ১১টি গোল। শনিবার বাম্বোলিমের জিএমসি স্টেডিয়াম সাক্ষী হয়ে থাকল এই এগারো গোলের ম্যাচের, যেখানে ৬-৫-এ এসসি ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে দিল ওডিশা এফসি। নিয়মরক্ষার্থে দুই দল এ দিন মাঠে নামলেও সীমাহীন উত্তেজনায় ভরপুর এই ম্যাচই হয়ে উঠল হিরো আইএসএলের অন্যতম স্মরণীয় একটি ম্যাচ।

ওডিশার দলের দুই প্রতিভাবান ভারতীয় মিডফিল্ডার পল রামফাঙজোভা ও জেরি মাওয়িমিঙথাঙ্গা জোড়া গোল করেন। ওয়েলশ থেকে আসা এসসি ইস্টবেঙ্গলের মিডফিল্ডার অ্যারন হলোওয়েও দু’টি গোল করেন। লাল-হলুদ বাহিনীর পক্ষে অ্যান্থনি পিলকিংটন ও জেজে লালপেখলুয়া একটি করে গোল করেন। তাদের দ্বিতীয় গোলটি আসে ওডিশার গোলকিপার রবি কুমারের হাতে লেগে। অর্থাৎ নিজগোলে। লালরেজুয়ালা ও দিয়েগো মরিসিও ওডিশার হয়ে বাকি দু’টি গোল করেন। 

সারা ম্যাচে বাইশ শতাংশ বেশি বল পজেশন থাকা সত্ত্বেও এ দিন এসসি ইস্টবেঙ্গল ম্যাচে নিয়ন্ত্রণ আনতে পারেনি মাঝমাঠ ও রক্ষণের ব্যর্থতায়। প্রথমার্ধে তারা ২-১-এ এগিয়ে থাকলেও দ্বিতীয়ার্ধে পরপর গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ে তারা। চার মিনিটের তাদের বিরুদ্ধে তিনটি গোল করে ৩-৩ থেকে ৬-৩-এ এগিয়ে যায় ওডিশা। গত ম্যাচে তারা মুম্বই সিটি এফসি-র কাছে ছ’গোল খেয়েছিল। এ দিন সেই ছ’টি গোল তারা ফিরিয়ে দিল এসসি ইস্টবেঙ্গলকে। অবশ্য নিজেদের ডিফেন্সের ব্যর্থতায় পাঁচটি গোল খেয়েও যায় তারা। তবে সব মিলিয়ে দুই দল মিলে এই ম্যাচে এক নতুন নজির গড়ে ফেলল। 

  • ২৪ মিনিট: মাঝমাঠ থেকে পাস পেয়ে ডানদিক দিয়ে উঠে বক্সে ঢুকে কোণাকুণি জোরালো শটে জালে বল জড়িয়ে দেন পিলকিংটন। (১-০)
  • ৩৩ মিনিট: মাথায় ব্র্যাড ইনম্যানের বাঁকানো কর্নারের পরে এসসি ইস্টবেঙ্গলের গোললাইনের সামনে জটলার মধ্যে থেকে বল আসে লালরেজুয়ালার পায়ে। তিনি গোলে বল ঠেলে দেন। (১-১)
  • ৩৭ মিনিট: মাঘোমা বাঁ দিকের উইং দিয়ে বক্সে ঢুকে গোলের সামনে পাস দেন অ্যারনকে। তাঁর শট রবির হাতে লেগে ওনুর পায়ে আসে। তিনি ক্লিয়ার করতে গিয়ে রবির গায়ে লেগে গোল। (২-১)
  • ৪৯ মিনিট: বক্সের বাঁ দিক থেকে দেওয়া ইনম্যানের সেন্টার নিয়ে বক্সের মাথা থেকে সোজা গোলে শট নেন তরুণ মিডফিল্ডার পল। (২-২)
  • ৫১ মিনিট: তৃতীয় গোল করে এগিয়ে যায় ওডিশা। এ বার গোল করেন জেরি। ডানদিক থেকে মানুয়েল ওনুর ক্রস হেড করে গোল করেন তিনি। (২-৩)
  • ৬০ মিনিট: এসসি ইস্টবেঙ্গল সমতা এনে ফেলে অ্যারন হলোওয়ের দূরপাল্লার শটের গোলে। বক্সের মাথা থেকে জোরালো শটে গোল করেন তিনি। (৩-৩)
  • ৬৬ মিনিট: পলের দ্বিতীয় গোলে ফের এগিয়ে যায় ওডিশা। বক্সের মাথা থেকে পলের মাটি ঘেঁষা শট আটকাতে পারেননি সুব্রত। (৩-৪)
  • ৬৭ মিনিট: বক্সের মধ্যে রাখা মরিসিওর লবে নিখুঁত ভলিতে গোল দেন জেরি। (৩-৫)
  • ৬৯ মিনিট: ইস্টবেঙ্গল বক্সের ঠিক বাইরে থেকে নেওয়া ফ্রি কিকে সোজা জালে বল জড়িয়ে দেন মরিসিও। এই নিয়ে চলতি লিগের ১২ নম্বর গোলটি করে ফেলেন তিনি। (৩-৬)
  • ৭৪ মিনিট: ম্যাচের দশ নম্বর গোলটি করেন জেজে লালপেখলুয়া। বক্সের মধ্যে ব্রাইটের ক্রস পেয়ে পিলকিংটন বল দেন গোলের সামনে থাকা জেজে-কে। তিনি দুর্দান্ত হেডে গোল করেন। (৪-৬)
  • ৯৫ মিনিট: স্টপেজ টাইমে হেডে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান কমান অ্যারন। (৫-৬)

গত ম্যাচে দলে আটটি পরিবর্তন করে নেমেছিল এসসি ইস্টবেঙ্গল, শনিবারের ম্যাচে নটি পরিবর্তন করে নামে তাদের দল। গত ম্যাচের প্রথম এগারোর শুধু সার্থক গলুই ও অ্যারন হলোওয়ে এ দিন প্রথম একাদশে জায়গা পান। তবে দল হিসেবে এই ম্যাচে কিছুটা হলেও শক্তিশালী ছিল লাল-হলুদ বাহিনী।

জাক মাঘোমা, অ্যান্থনি পিলকিংটন ও ব্রাইট ইনোবাখারের ত্রয়ী এ দিন মাঠে থাকায় এসসি ইস্টবেঙ্গলের খেলার মধ্যে শুরু থেকেই আক্রমণে ওঠার প্রবণতা দেখা যায়। ১৭ মিনিটের মাথায় সুরচন্দ্র সিং-এর ক্রসে যদি ঠিকমতো পা লাগাতে পারতেন অ্যারন, তা হলে হয়তো গোল পেতেন। ১৯ মিনিটের মাথায় সুরচন্দ্রর মাপা কর্নার গোলকিপারের গ্লাভস ছুঁয়ে ক্রসবারে লাগে।

তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি সমর্থকদের। ২৪ মিনিটের মাথাতেই এক দর্শনীয় গোল করে দলকে এগিয়ে দেন অ্যন্থনি পিলকিংটন। মাঝমাঠ থেকে পাস পেয়ে ডানদিক দিয়ে উঠে বক্সে ঢুকে কোণাকুণি জোরালো শটে জালে বল জড়িয়ে দেন পিলকিংটন।

গোল খাওয়ার পরে কাউন্টার অ্যাটাকে উঠতে শুরু করে ওডিশা এফসি। এক গোলের এই ব্যবধান বেশিক্ষণ বজায় রাখতে পারেনি লাল-হলুদ ব্রিগেড। ৩৩ মিনিটের মাথায় ব্র্যাড ইনম্যানের বাঁকানো কর্নার এসসি ইস্টবেঙ্গল ডিফেন্ডাররা ক্লিয়ার করতে না পারায় গোললাইনের সামনে জটলার মধ্যে থেকে বল আসে লালরেজুয়ালার পায়ে। তিনি গোলে বল ঠেলে দেন।

এর চার মিনিট পরেই গৌরব ভোরার পা থেকে বল ছিনিয়ে নিয়ে বাঁ দিক দিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে গোলে শট নেন পিলকিংটন, যা বাঁচিয়ে দেন ওডিশার গোলকিপার রবি। কিন্তু এই আক্রমণের পরের আক্রমণেই ফের গোল পেয়ে যায় এসসি ইস্টবেঙ্গল।

মাঘোমা বাঁ দিকের উইং দিয়ে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে গোলের সামনে পাস দেন অ্যারনকে উদ্দেশ্য করে। অ্যারন বল গোলে ঠেললে তা গোলকিপারের হাতে লেগে মানুয়েল ওনুর পায়ে আসে, তিনি ক্লিয়ার করতে গিয়ে বল রবির গায়ে মারেন ও সেই বল গোলে ঢুকে যায়।

৪৪ মিনিটের মাথায় ব্যবধান বাড়াতে পারতেন ব্রাইট। মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে বিপক্ষের দুই ডিফেন্ডারকে বোকা বানিয়য়ে বক্সের মধ্যে ঢুকে গোলে শট নেন তিনি। কিন্তু রবি কুমার এ যাত্রায় বাঁচিয়ে দেন দলকে।

বিরতির পর খেলা শুরু হতেই ফের সমতা (২-২) আনে ওডিশা। ৪৯ মিনিটে বক্সের বাঁ দিক থেকে দেওয়া ইনম্যানের সেন্টার নিয়ে বক্সের মাথা থেকে সোজা গোলে শট নেন তরুণ মিডফিল্ডার পল রামফাঙজোভা, যা আটকাতে পারেননি অভিজ্ঞ গোলকিপার সুব্রত পাল।

 শুধু সমতা এনেই সন্তুষ্ট হয়নি ওডিশা, পরের মিনিটে তৃতীয় গোল করে এগিয়ে যায় তারা। এ বার গোল করেন জেরি। ডানদিক থেকে মানুয়েল ওনুর ক্রস হেড করে গোল করেন জেরি এবং তা মাটিতে ড্রপ করে গোলে ঢুকে যায়।

৫৪ মিনিটের মাথায় এই ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড দিয়েগো মরিসিও। বাঁ দিক থেকে ওনুর ক্রসে গোলের সামনে হেড করেন তিনি, যা পোস্টে লেগে ফিরে আসে।

ওই সুযোগে ওডিশা ব্যবধান বাড়াতে না পারলেও ছমিনিট পরে এসসি ইস্টবেঙ্গল সমতা এনে ফেলে (৩-৩) অ্যারন হলোওয়ের দূরপাল্লার শটে করা গোলে। বক্সের মাথা থেকে জোরালো শটে গোল করে দেন তিনি।

এর পরে চার মিনিটের মধ্যে যা হয়, তা শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, ছিল অভাবনীয়ও। এই সময়ে তিন-তিনটি গোল করে ৩-৩ থেকে ৬-৩ করে ফেলে। ৬৬ মিনিটের মাথায় ফের পলের দ্বিতীয় গোলে ৪-৩-এ এগিয়ে যায় ওডিশা। বক্সের মাথা থেকে পলের মাটি ঘেঁষা শটও আটকাতে পারেননি সুব্রত। এই গোলের এক মিনিট পরে ৫-৩ করে ফেলে ওডিশা এফসি। বক্সের মধ্যে রাখা মরিসিওর লবে ভলিতে গোল দেন জেরি। ৬৯ মিনিটে ইস্টবেঙ্গল বক্সের ঠিক বাইরে থেকে নেওয়া ফ্রি কিকে সোজা জালে বল জড়িয়ে দেন মরিসিও। এই নিয়ে চলতি লিগের ১২ নম্বর গোলটি করে ফেলেন তিনি।

৭৪ মিনিটের মাথায় ম্যাচের দশ নম্বর গোলটি করেন এসসি ইস্টবেঙ্গলের ফরোয়ার্ড জেজে লালপেখলুয়া। তাঁকে গোলটি তৈরি করে দেওয়ার কৃতিত্ব দাবি করতেই পারেন ব্রাইট ও পিলকিংটন। বক্সের মধ্যে ব্রাইটের ক্রস পেয়ে পিলকিংটন বল দেন গোলের সামনে থাকা জেজে-কে। তিনি এক দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়িয়ে দেন।

এর পরেও ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করে এসসি ইস্টবেঙ্গল। ৭৯ মিনিটে পিলকিংটনের শট গোলের বাইরে চলে যায় ও তার পাঁচ মিনিট পরে অ্যারনের শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। ৮৯ মিনিটে সার্থক গলুইয়ের শটও বারের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। সেই চেষ্টা কিছুটা হলেও কাজে লাগে, যখন স্টপেজ টাইমে হেডে নিজের দ্বিতীয় গোল করে ব্যবধান কমান অ্যারন। তবে হার বাঁচাতে পারেনি লাল-হলুদ ব্রিগেড।     

এসসি ইস্টবেঙ্গল দল: সুব্রত পাল (গোল), সার্থক গলুই, রাণা ঘরামি (জেজে), ড্যানিয়েল ফক্স, নারায়ণ দাস, সুরচন্দ্র সিং (মহম্মদ রফিক), জাক মাঘোমা, ওয়াহেংবাম লুয়াং, অ্যান্থনি পিলকিংটন, অ্যারন হলোওয়ে, ব্রাইট ইনোবাখারে

পরিসংখ্যানের যুদ্ধ

বল পজেশন: এসসি ইস্টবেঙ্গল ৬১% - ওডিশা এফসি ৩৯%

সফল পাস: ৫১২/৬২৯ (৮১%) - ২১৯/৩২৮ (৬৭%)

গোলে শট: ৬-৬

ফাউল: ১৩-১৬

ইন্টারসেপশন: ১০-১৯

কর্নার: ৫-২

হলুদ কার্ড: ২-২

ম্যাচের হিরো: পল রামফাঙজোভা

Your Comments

Your Comments