চ্যাম্পিয়ন্স লিগের কঠিনতম লড়াইয়ে দেশপ্রেম ও আত্মবিশ্বাস সম্বল এফসি গোয়ার

এশিয়ার সেরা ক্লাব-লিগের আসর এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে অভিষেকের বছরে শুরুর দুই প্রশ্নপত্রে অপ্রত্যাশিত ফল করার পরে এ বার সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার সামনে ভারতের একমাত্র প্রতিনিধি এফসি গোয়া। মঙ্গলবার স্প্যানিশ কোচ হুয়ান ফেরান্দোর দলের সামনে গ্রুপের সবচেয়ে শক্তিশালী দল, গতবারের রানার্স ইরানের পার্সেপোলিস এফসি।

এর আগের দুই প্রতিপক্ষ আল রাইয়ান ও আল ওয়াহদাও কম শক্তিশালী ছিল না। তবে দুই ক্লাবকেই গোলশূন্য ড্রয়ে রুখে দিয়ে তাদের গ্রুপ ই (পশ্চিমাঞ্চল)-র লিগ টেবলে তিন ও চার নম্বরে পাঠিয়ে নিজেরা দুনম্বরে উঠে পড়েছে এফসি গোয়া। অন্য দুই দলকেই হারানোর পরে পার্সেপোলিস মঙ্গলবার ভারতীয় ক্লাবের বিরুদ্ধে তাদের বিজয়রথ সচল রাখার লক্ষ্য নিয়েই যে নামবে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

অন্যদিকে, প্রথম দুই ম্যাচে অপ্রত্যাশিত ভাল খেলে অর্জন করা আত্মবিশ্বাস এই কঠিনতম ম্যাচে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুত এফসি গোয়া। আবেগে ভেসে না গিয়ে সঠিক কৌশল অনুযায়ী নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিয়ে এই ম্যাচেও তেমনই অপ্রত্যাশিত ফল করার লক্ষ্য নিয়ে নামবে ফেরান্দোর দল।

খেতাবজয় সম্ভব নয়, কিন্তু...

সোমবার তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যদি শুধু স্কোর নিয়ে কথা বলি, তা হলে এটা ঠিকই যে চার পয়েন্ট আমরা খুইয়েছি। তবে আমি এই লিগ আর আমার দল সম্পর্কে জানি। আমাদের অভিজ্ঞতা, অন্য দলগুলির বাজেট, ভারতের তুলনায় অন্য লিগগুলোর মান। এগুলোও মাথায় রাখতে হবে। যথাসম্ভব পয়েন্ট অর্জন করাই আমাদের লক্ষ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল দলের উন্নতি। এফসি গোয়ার লক্ষ্য আরও অভিজ্ঞতা অর্জন করা এবং আরও বড় লক্ষ্যে সেগুলোকে কাজে লাগানো

দলের চূড়ান্ত লক্ষ্য যে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের চ্যাম্পিয়নের খেতাব জেতা, তা জানিয়ে বাস্তববাদী ফেরান্দো বলেন, তবে (এখনই) তা সম্ভব নয়। কারণ, সেটা খুবই কঠিন কাজ। এখন আমাদের প্রতি ম্যাচ ধরে ধরে এগাতে হবে। কাল আমাদের প্রতিপক্ষ যে খুবই কঠিন, তা আমরা জানি। ওরা গতবারে কেমন খেলেছিল, তাও জানি

এমন শক্তিশালী একটা দলকে কী ভাবে আটকাবেন, তা নিয়ে ফেরান্দো বলেন, ওদের খেলোয়াড়রা এই লিগে খেলার ব্যাপার যথেষ্ট অভিজ্ঞ। প্রায় তিনটি মরশুম ওরা একসঙ্গে খেলছে। আর আমাদের দলের ছেলেরা মাস চারেক ধরে একসঙ্গে খেলছে। সুতরাং, বলতে পারেন ওদের চেয়ে প্রায় তিন ধাপ পিছিয়ে রয়েছি আমরা। আমাদের দল যে একাধিক বিষয়ে উন্নতি করেছি, সেটা ঠিকই। দলের ছেলেদের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে। কিন্তু ওদের মতো দলের বিরুদ্ধে নামার আগে প্রস্তুতির যে সময়টা দরকার ছিল, সেটা তো পাইনি। দুটো ম্যাচের মধ্যে বেশি দিন পাইনি যে

বিপক্ষকে নিয়ে ফেরান্দোর পর্যবেক্ষণ, আগের দুটো ম্যাচের চেয়ে এই ম্যাচটা কঠিন। এই ম্যাচে তীব্রতা থাকবে। সেটা নির্ভর করছে বলের গতি কেমন থাকবে, তার ওপর। আল রাইয়ান ও পার্সেপোলিসের মধ্যে ম্যাচে ইরানের দল মূলত পজিশনাল অ্যাটাকে যাচ্ছিল। কিন্তু বলের দখল যখনই হারাচ্ছিল ওরা, তখনই বিপক্ষকে দুর্দান্ত ভাবে চাপে ফেলে দিচ্ছিল। রক্ষণে বেশি জায়গা নিয়ন্ত্রণ করছিল ওরাই। প্রচুর দৌড়লে বা ঘনঘন কড়া ট্যাকলে গেলেই খেলার তীব্রতা বাড়ে, তা নয়। সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েও তীব্রতা বাড়ানো যায়। এই সব দলের কাছে আমাদের এই ডিটেলগুলোই রপ্ত করতে হবে

কঠিন পরীক্ষায় কঠিন প্রশ্ন

ইরানের এই ক্লাব তাদের দেশের লিগে ২০ ম্যাচ পরে আপাতত শীর্ষে রয়েছে। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে তাদের ইতিহাসও বেশ ভাল। দুবার ফাইনালে খেলেছে তারা। ১৩ বার শীর্ষলিগের ট্রফি নিজেদের ঘরে তুলে দেশের সেরা ক্লাবের তকমা অর্জন করে নিয়েছে তারা। গত চার বছর ধরেই তারা দেশের এক নম্বর দল।

চলতি লিগে আল ওয়াহদার বিরুদ্ধে জালাল হোসেইনির একমাত্র গোলে জেতে তারা। আল রাইয়ানকে ৩-১ গোলে হারায় শাহরিয়ার মোঘানলুর জোড়া গোল ও কামাল কামিয়াবিনিয়ার গোলে। মঙ্গলবারের ম্যাচে দলগত দ্বৈরথের পাশাপাশি একাধিক ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দিতাও দেখা যেতে পারে। যেমন মোঘানলুর সঙ্গে লড়াই হতে পারে ইভান গঞ্জালেসের। ২৬ বছর বয়সি দীর্ঘদেহী সেন্টার ফরোয়ার্ড মোঘানলুকে সামলানো মোটেই সোজা হবে না গঞ্জালেসের পক্ষে। গত দুই ম্যাচে গঞ্জালেস সেরা ছন্দে থাকলেও মোঘানলুর মতো এত ক্ষিপ্র ও সুযোগসন্ধানী ফরোয়ার্ডকে সামলানোর অভিজ্ঞতা বোধহয় এখনও হয়নি। তাই তাঁকে আগের দুই ম্যাচের চেয়েও ভাল পারফরম্যান্স দেখাতে হবে এ দিন। মোঘানলুকে সামান্য জায়গা ছাড়লেই বিপদ।

ইশান পন্ডিতা গত দুই ম্যাচেই প্রথম এগারোয় শুরু করলেও সুপার সাব হিসেবে যতটা আলোড়ন ফেলে দিয়েছিলেন, ততটা এ বার পেরে ওঠেননি। মঙ্গলবার তাঁকে সামলানোর জন্য যদি জালাল হোসেইনিকে নিয়োগ করা হয়, তা হলে সেই লড়াইটা তরুণ ভারতীয় স্ট্রাইকারের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ৩৯ বছর বয়সি সেন্টার ব্যাক জালাল অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে মাঠে নামেন। তিন বছর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায় নিলেও ক্লাবের রক্ষণে তিনি এখনও স্তম্ভের মতো। তাঁর চেয়ে ১৭ বছরের বড় এই ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে বিপক্ষের গোলে বল রাখাটা ইশানের পক্ষে কঠিন ঠিকই। কিন্তু হিরো আইএসএলে যে ক্ষিপ্রতা দেখা গিয়েছে তাঁর মধ্যে, তা ফিরে এলে কিন্তু এই দ্বৈরথটা জমে যেতে পারে।

ইরানীয় দলের অন্যতম সেরা তারকা মেহদি তোরাবিকে সামলানোর দায়িত্ব নিতে পারেন সেরিটন ফার্নান্ডেজ। ২৬ বছর বয়সি এই বিপজ্জনক উইঙ্গারকে আটকানোর দায়িত্ব যদি তিনি নেন, তা হলে সেরিটনকে জীবনের সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে হবে। তোরাবি ইরানের জাতীয় দলের নিয়মিত খেলোয়াড়, যাঁকে সে দেশের ফুটবলে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার আখ্যাও দেওয়া হয়। আগ্রাসী শরীরী ভাষা ও প্রবল গতিতে বল নিয়ে দৌড়নোর ক্ষমতাই এই তারকার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট। সেরিটনের একার পক্ষে তোলাবিকে আটকানো সম্ভব কি না, সেটাও প্রশ্ন। বাঁ দিকের উইং দিয়ে তোরাবি বল নিয়ে দৌড় শুরু করলে তাঁর বিপক্ষের বক্সে ঢোকা আটকানো বেশ কঠিন কাজ। তাঁকে নিজেকে ছাপিয়ে গিয়ে মার্ক করতে পারলে সফল হতে পারেন সেরিটন।

ধীরজের দেশপ্রেম

তরুণ গোলকিপার ধীরজ সিংয়ের ওপর অনেক ভরসা করতে হবে ফেরান্দোকে। প্রবল চাপও থাকবে তাঁর ওপর। গত দুই ম্যাচেই অসাধারণ গোলকিপিং করেছেন ২০ বছরের ধীরজ। একাধিক নিশ্চিত গোল আটকে ক্লিন শিট বজায় রেখেছেন তিনি। এই ম্যাচেও তাতে আঁচড় পড়তে দিতে না চাইলে ধীরজকে জীবনের সেরা পারফরম্যান্স দিতে হবে মঙ্গলবার। আত্মবিশ্বাসী গোলপ্রহরীকে আরও উৎসাহ জোগাতে সাংবাদিক বৈঠকে তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন কোচ। অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপে দেশের জার্সি গায়ে মাঠে নামা ধীরজ বলেন, আমি তো শুধু ক্লাবের প্রতিনিধিত্ব করছি না, সারা দেশেরও প্রতিনিধিত্বও করছি। আমার দিকে আসা যে কোনও বলই আমাকে আটকাতে হবে। তবে এটা দলের খেলা, আমাদের দল হিসেবে লড়াই করতে হবে। তবে আমাকে অযথা বিশাল উচ্চতায় তুলে ধরবেন না। নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এখনও অনেক উন্নতি করতে হবে আমাকে

এটিকে মোহনবাগানে ম্যাচের পর ম্যাচ বসে থাকার পরে তিনি এফসি গোয়াতে আসেন। এই বদলটাই তাঁর জীবন পাল্টে দিয়েছেন বলে মনে করেন ধীরজ। বলেন, গোয়ায় এসে আমি নিজের ছন্দ ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছি। এই ক্লাবে আসার আগে দেড় বছরে একটা ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছি আমি। এটা শিখেছি যে, সব কিছু অবশ্য মর্জিমতো পাওয়া সম্ভব নয়। মঙ্গলবার ফুটবলজীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তাঁর।    

ম্যাচ: এফসি গোয়া বনাম পার্সেপোলিস এফসি

লিগ: এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ গ্রুপ পর্ব

স্থান: জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়াম, ফতোরদা

সময়: রাত ১০.৩০ (ভারতীয় সময়)

সরাসরি সম্প্রচার: স্টার স্পোর্টস নেটওয়ার্ক

লাইভ স্ট্রিমিং: ডিজনি হটস্টার ভিআইপি, জিও টিভি

Your Comments

Your Comments