এএফসি কাপের গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে তাদের চার গোলে হারিয়ে অভিযান শুরু করেছিল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। সেই ওডিশা এফসি ফিরতি লিগে তাদের বিরুদ্ধে ৫-২-এ জিতে এশীয়স্তরের অন্যতম সেরা ক্লাব টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব থেকে ছিটকে দিল সবুজ-মেরুন বাহিনীকে।

সোমবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে শুরুতে গোল করে এগিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও সেই ব্যবধান ধরে রাখতে পারল না মোহনবাগান এসজি। এই ম্যাচে জিতে ওডিশা এফসি উঠে এল এএফসি কাপের ডি গ্রুপের দু’নম্বরে। এ দিন আগের ম্যাচে ঢাকার বসুন্ধরা কিংস নিজেদের মাঠে মলদ্বীপের মাজিয়া এসআরসি-কে ২-১ গোলে হারিয়ে গ্রুপশীর্ষেই থেকে গেল।

শেষ রাউন্ডে বসুন্ধরা ও ওডিশা মুখোমুখি হবে ভুবনেশ্বরের কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে। ১১ ডিসেম্বর সেই ম্যাচে জিতলে বা ড্র করলে বসুন্ধরাই গ্রুপসেরা হয়ে পরের রাউন্ডে চলে যাবে। কিন্তু ওডিশা জিতলে তারাই এই গ্রুপ থেকে পরের রাউন্ডে উঠবে। মোহনবাগান শেষ ম্যাচে মাজিয়া এসআরসি-কে হারালেও গ্রুপসেরা হিসেবে পরবর্তী রাউন্ডে যাওয়ার আর কোনও আশা রইল না তাদের। 

ম্যাচের ১৭ মিনিটের মাথায় গোল করে মোহনবাগান এসজি-কে এগিয়ে দেন হুগো বুমৌস। কিন্তু ২৯ ও ৩২ মিনিটের মাথায় পরপর গোল করে তাদের পাল্টা চাপে ফেলে দেন যথাক্রমে প্রাক্তন সবুজ-মেরুন তারকা রয় কৃষ্ণা ও দিয়েগো মরিসিও। ৪১ মিনিটের মাথায় ব্যবধান বাড়িয়ে নেন ওডিশার সাই গদার্ড। ৬৩ মিনিটের মাথায় একটি গোল শোধ করেন মোহনবাগানের পরিবর্ত স্ট্রাইকার কিয়ান নাসিরি। কিন্তু ম্যাচের শেষে বাড়তি সময়ে পরপর দুটি গোল করে ওডিশার জয় সুনিশ্চিত করেন দুই সুপারসাব অনিকেত যাদব ও ইসাক ভানলালরুয়াতফেলা।  

এ দিন পাঁচ বিদেশি নিয়ে খেলা শুরু করে মোহনবাগান। যেখানে আহত দিমিত্রিয়স পেট্রাটস ছাড়া সবাই ছিলেন। রক্ষণে ব্রেন্ডান হ্যামিল, হেক্টর ইউস্তে, মাঝমাঠে হুগো বুমৌস, আক্রমণে আরমান্দো সাদিকু ও জেসন কামিংস। শেষ দুজনকে সামনে রেখে ৩-৪-২-১ ছকে খেলা শুরু করে তারা। অন্যদিকে, ওডিশা এফসি-র আক্রমণে ছিলেন রয় কৃষ্ণা, দিয়েগো মরিসিও, সাই গদার্ড। মাঝমাঠে আহমেদ জাহু ও রক্ষণে কার্লোস দেলগাদো। তারা শুরু করে ৪-২-৩-১-এ।

অন্য ম্যাচে বসুন্ধরা কিংস মাজিয়া এসআরসি-কে ২-১-এ হারিয়ে দেওয়ায় পরের রাউন্ডে যাওয়ার জন্য মোহনবাগানের সামনে জয় ছাড়া কোনও উপায় ছিল না এ দিন। ওডিশার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সে কথা জেনেই এ দিন মাঠে নামে দুই দল এবং শুরু থেকেই আক্রমণে ওঠে। তৃতীয় মিনিটেই কামিংস বক্সের মধ্যে পড়ে যাওয়ায় পেনাল্টির দাবি তোলে মোহনবাগান। কিন্তু রেফারি তা নাকচ করে দেন। ছ’মিনিটের মাথায় কামিংসের পাস থেকে সহালের গোলমুখী শট সেভ করেন ওডিশা গোলকিপার অমরিন্দর। যদিও সহাল অফসাইড ছিলেন।

শুরুর দিকে কোলাসো, সাদিকু ও সহালের আক্রমণ সামলাতে হিমশিম খেয়ে যান ওডিশার ডিফেন্ডাররা। কিন্তু সারা ম্যাচে কামিংসকে সে ভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখা যায়নি। অন্যদিকে মরিসিও, জাহু, রয় কৃষ্ণারাও বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের বেশ চাপে রাখেন। তবে প্রথম সাফল্য পায় মোহনবাগানই। মাঝমাঠ থেকে ডান উইংয়ে আশিস রাইয়ের কাছে পাঠান কোলাসো। আশিস তা কোণাকুনি সেন্টার করেন বক্সের মধ্যে বাঁদিকে থাকা বুমৌসকে। তিনি এক ডিফেন্ডারকে ড্রিবল করে কোণাকুনি শটে তা জালে জড়িয়ে দেন (১-০)।

গোল খাওয়ার পর পাল্টা আক্রমণের অপেক্ষায় থাকা ওডিশা ক্রমশ প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলতে শুরু করে। মূলত ডান উইং দিয়ে আক্রমণে উঠতে শুরু করে এবং ৩০ মিনিটের মাথায় এই ডানদিক দিয়ে আক্রমণের জেরেই সমতা এনে ফেলে তারা। নিজেদের গোলের সামনে থেকে হেড করে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে তা রয় কৃষ্ণার কাছে পাঠিয়ে দেন আশিস রাই। এই সুযোগ হাতছাড়া করেননি কৃষ্ণা। বক্সের ডানদিক থেকে কোণাকুনি শটে জালে বল জড়িয়ে দেন প্রাক্তন মোহনবাগানী (১-১)। তিনি ওই সময় প্রায় অরক্ষিতই ছিলেন।

কিন্তু তিন মিনিটের মধ্যে যে ঘটনা ঘটে, তার জন্য বোধহয় তৈরি ছিল না মোহনবাগান রক্ষণ। জাহুর ফ্রিকিক থেকে বল পেয়ে ডানদিকে দিয়ে উঠে গোলের সামনে মরিসিওকে ক্রস দেন রয়। যা গোললাইনের সামনে থেকে ছোট্ট টোকায় গোলে ঠেলে দেন ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড (১-২)। তাঁকে পাহাড়ায় রাখলেও আটকাতে পারেননি শুভাশিস। সমতা আনার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে মোহনবাগান এবং বাঁ উইং দিয়ে পরপর কয়েকটি আক্রমণ তৈরি করেন কোলাসো। কিন্তু তাঁকে আটকে দেন ওডিশার রক্ষণ।

গোলশোধ করার জন্য মরিয়া সবুজ-মেরুন শিবির প্রায় সবাই প্রতিপক্ষের অর্ধে উঠে যাওয়া শুরু করে এবং এই সুযোগটাই কাজে লাগায় ওডিশা। ৪১ মিনিটের মাথায় মাঝামাঠ থেকে মরিসিওর পাস পেয়ে তীব্র গতিতে দৌড়ে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে পড়েন সাই গদার্ড। তাঁকে পিছন থেকে তাড়া করে বক্সের মধ্যে ধরে ফেলেন গ্ল্যান মার্টিন্স। কিন্তু হঠাৎ থমকে গিয়ে ডানদিকে কাট-ইন করে ডান পায়ে সোজা গোলে শট নেন, যা আটকাতে ব্যর্থ হন এগিয়ে আসা গোলকিপার বিশাল কয়েথ (১-৩)।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে মোহনবাগানের আক্রমণে তেমন তীব্রতা না থাকায় ৫৬ মিনিটের মাথায় কিয়ান নাসিরি ও অনিরুদ্ধ থাপাকে নামান কোচ হুয়ান ফেরান্দো। তুলে নেন আরমান্দো সাদিকু ও গ্ল্যান মার্টিন্সকে। পরের মিনিটেই বাঁ দিকের উইং থেকে নেওয়া ফ্রি কিক বারের নীচ দিয়ে গোলে ঢোকার আগেই ওডিশা গোলকিপার অমরিন্দর তা ফিস্ট করে বের করে দেন।

কিয়ান আসায় মোহনবাগানের আক্রমণে গতি আসে। এবং কোচের এই সিদ্ধান্ত কাজে লেগে যায় মিনিট ছয়েকের মধ্যেই, যখন দুর্দান্ত হেড করে মোহনবাগানকে দ্বিতীয় গোল এনে দেন তিনি। ৬৩ মিনিটের মাথায় বাঁ দিক দিয়ে দ্রুত বল নিয়ে ওঠা বুমৌসের ক্রসটিও যেমন নিখুঁত ছিল, তেমনই গোলের সামনে অনেকটা লাফিয়ে নাসিরির হেডটিও ছিল তেমনই নিখুঁত (২-৩)।

দ্বিতীয় গোল পাওয়ার পরই সমতা আনার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে হোম টিম। ৬৭ মিনিটের মাথায় ওডিশার বক্সের বাঁ দিক থেকে কোণাকুনি শটে দ্বিতীয় পোস্ট দিয়ে গোলে শট নেন সহাল। কিন্তু তা পোস্টের কয়েক ইঞ্চি বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যায়। ৭১ মিনিটের মাথায় বুমৌসের গোলমুখী শট বাঁচান অমরিন্দর। এর পরেই কোলাসো বক্সের মাথা থেকে গোলে শট নেন, যা বারের অনেক ওপর দিয়ে উড়ে যায়।

কিয়ান নাসিরি তাঁর স্কিলের অসাধারণ এক উদাহরণ দেন ৭৫ মিনিটের মাথায়, যখন তাঁকে ঘিরে ধরা চার ডিফেন্ডারের কবল থেকে নিজেকে বার করে এনে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে বক্সের মধ্যে বাঁ দিক থেকে গোলে শট নেন। কিন্তু তা প্রথম পোস্টের ওপর দিয়ে বেরিয়ে যায়। ৭০ মিনিটের পর থেকে খেলা মূলত ওডিশার বক্সের আশেপাশেই হয় এবং মোহনবাগানের আক্রমণের তীব্রতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তাদের আটকাতে প্রায় গোটা ওডিশা দলই নিজেদের বক্সে নেমে আসে। এই সময় বল পজেশনেও অনেক এগিয়ে ছিল কলকাতার দল।

৮২ মিনিটের মাথায় ফের সুযোগ তৈরি করে নেয় মোহনবাগান। বাঁ দিক দিয়ে উঠে পিছনে থাকা শুভাশিসকে পাস করেন সহাল। শুভাশিস কোণাকুনি শট নিলেও তা সাইডনেটে ধাক্কা খায়। এর মধ্যেই ৮৬ মিনিটের মাথায় জাহুর ফ্রি কিক থেকে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়ে যান ওডিশার নরিন্দার গেহলট। কিন্তু গোল লাইনের সামনে থেকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন তিনি। এই সময়ে অরক্ষিত ছিলেন গেহলট।

নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার দু’মিনিট আগে আশিসকে তুলে সুহেল ভাটকে নামায় মোহনবাগান। হ্যামিলের জায়গায় নামেন দীপক টাঙরি। উদ্দেশ্য অবশ্যই আক্রমণে তীব্রতা বাড়ানো। কিন্তু এর ফল হয় উল্টো। এতটাই হাইলাইন ফুটবল খেলছিল মোহনবাগান যে, রক্ষণের দিকে খেয়ালই ছিল না তাদের। ইনজুরি টাইমে ডানদিক থেকে রয়ের ক্রসে পা ছুঁইয়ে ওডিশাকে চতুর্থ গোল এনে দেন সুপার-সাব অনিকেত যাদব (২-৪) এবং ৯৫ মিনিটের মাথায় কাউন্টার অ্যাটাকে উঠে বক্সের বাইরে থেকে নিখুঁত ভলিতে দলকে পাঁচ নম্বর গোল এনে দেন আর এক সুপার-সাব ইসাক ভানলালরুয়াতফেলা (২-৫)। ওই সময়ে মোহনবাগান অর্ধে গোলকিপার ছাড়া তাদের বড়জোর আর জনাদুয়েক ফুটবলার ছিলেন। এর পরে আর মোহনবাগানের কিছুই করার ছিল না।    

মোহনবাগান এসজি দল: বিশাল কয়েথ (গোল), ব্রেন্ডান হ্যামিল (দীপক টাঙরি), হেক্টর ইউস্তে, শুভাশিস বোস, আশিস রাই (সুহেল ভাট), হুগো বুমৌস, গ্ল্যান মার্টিন্স (অনিরুদ্ধ থাপা), লিস্টন কোলাসো, সহাল আব্দুল সামাদ, আরমান্দো সাদিকু (কিয়ান নাসিরি), জেসন কামিংস।