ম্যাচের বয়স এক মিনিট হওয়ার আগেই গোল করে এগিয়ে যায় ইস্টবেঙ্গল এফসি। কিন্তু তার পর আক্রমণে যে ঝড় তোলে ওডিশা এফসি, সেই ঝড় সামলাতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ে কলকাতার দল। যার ফল, দুই অর্ধে দু’গোল করে ম্যাচের শেষে ২-১-এ জয়ের হাসি হাসতে হাসতে মাঠ ছাড়েন রয় কৃষ্ণা, দিয়েগো মরিসিওরা। 

বৃহস্পতিবার ভুবনেশ্বরের কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে উত্তেজনায় ঠাসা ম্যাচে চলতি লিগের দশ নম্বর জয় পেয়ে ১৭ ম্যাচে ৩৫ পয়েন্ট লিগ টেবলের শীর্ষেই রয়ে গেল সের্খিও লোবেরার দল। শনিবার পাঞ্জাব এফসি যদি মুম্বই সিটি এফসি-র বিরুদ্ধে হেরে যায়, তা হলে সে দিনই প্লে-অফে জায়গা পাকা করে ফেলবে কলিঙ্গবাহিনী।   

কিন্তু এই ম্যাচ হারের ফলে ইস্টবেঙ্গলের সামনে সমূহ বিপদ। গত ম্যাচে জিতে ছ’নম্বর জায়গাটার দৌড়ে তারা অনেকটাই এগিয়ে গিয়েছিল তারা। কিন্তু বৃহস্পতিবার ওডিশার কাছে হেরে তাদের সেরা ছয়ে যাওয়ার রাস্তা ফের বেশ কঠিন হয়ে গেল। তাদের পরবর্তী তিনটি ম্যাচ এফসি গোয়া, মোহনবাগান এসজি ও কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে। পরের তিন ম্যাচেই তাদের সামনে কঠিন প্রতিপক্ষ। এই তিন ম্যাচে অসাধ্য সাধন করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে মাঠে নামতে হবে ক্লেটন সিলভাদের। সেই চ্যালেঞ্জ জিততে পারলে তবেই তাদের প্লে-অফে জায়গা পাকা হতে পারে। 

বৃহস্পতিবার পিভি বিষ্ণু ৩২ সেকেন্ডের মাথায় একক দক্ষতায় দুর্দান্ত এক গোল করে দলকে এগিয়ে দিলেও তাঁর এই মনে রাখার মতো গোল দলের কাজে এল না। ৪০ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে গোল করে সমতা আনেন ওডিশার দলের ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড দিয়েগো মরিসিও ও ৬১ মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে গোল করে দলকে জয় এনে দেন ম্যাচের সেরা ফুটবলার মিডফিল্ডার প্রিন্সটন রেবেলো। ইস্টবেঙ্গলের ডিফেন্ডারদের ভুল কাজে লাগিয়েই এই দু’টি গোল পায় ওডিশা এফসি।

দ্বিতীয়ার্ধে রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে নাওরেম মহেশ, নন্দকুমার শেকর, শৌভিক চক্রবর্তীর নামার পরে ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণের তীব্রতা ও গতি অনেকটাই বাড়ে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে যে পারফরম্যান্স দেখায় তারা, তা যদি প্রথমার্ধে দেখাতে পারত, তা হলে বোধহয় ম্যাচের ছবিটা অন্যরকম হত। ৯০ মিনিটে ওডিশা যেখানে ১৫টি গোলের সুযোগ তৈরি করে, সেখানে ইস্টবেঙ্গলও ১০টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এর মধ্যে বেশিরভাগই ছিল দ্বিতীয়ার্ধে। প্রথম এগারোয় পাঁচ-পাঁচটি বদল আনার সিদ্ধান্তেরই মাশুল কার্লস কুয়াদ্রাতের দলকে এ দিন দিতে হয়। 

এ দিন অপ্রত্যাশিত ভাবে শৌভিক চক্রবর্তী, নন্দকুমার শেকর, নাওরেম মহেশ সিং ও নিশু কুমারের মতো প্রথম দলে থাকা খেলোয়াড়দের রিজার্ভ বেঞ্চে রেখে দল নামায় ইস্টবেঙ্গল। তাঁদের জায়গায় সম্ভবত প্রতিপক্ষকে সারপ্রাইজ দিয়ে তাদের পরিকল্পনা বানচাল করতেই এই সিদ্ধান্ত নেন ইস্টবেঙ্গলের কোচ কার্লস কুয়াদ্রাত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্তই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে তাদের কাছে। যদিও কার্ড সমস্যার জন্য কুয়াদ্রাত এ দিন সাইড লাইনে ছিলেন না। দলকে এ দিন অন্য ছকেও সাজান ভারপ্রাপ্ত কোচ দিমাস দেলগাদো 

হিজাজি মাহের এ দিন কার্ড সমস্যার জন্য খেলতে পারেননি। প্রথম দলে অজয় ছেত্রী, ভিপি সুহের, আলেকজান্দার প্যানটিচ, পিভি বিষ্ণু ও মন্দার রাও দেশাইকে ইস্টবেঙ্গলের প্রথম এগারোয় দেখা যায়। ওডিশা এফসি-র আহমেদ জাহু প্রথম দলে ফেরেন মুর্তাদা ফলের জায়গায় ও নরেন্দর গেহলট প্রথম এগারোয় আসেন লেনি রড্রিগেজের জায়গায়। 

কিন্তু এ দিন প্রথম মিনিটেই বিষ্ণু যে ভাবে গোল করেন তা ছিল সত্যিই চমকে দেওয়ার মতো। থ্রো ইন-এর পর মাঝমাঠ থেকে আসা প্যানটিচের পাস থেকে বল পেয়ে কার্লোস দেলগাদো-সহ ওডিশার তিন ডিফেন্ডারকে ধোঁকা দিয়ে কাট ইন করে বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ে প্রথম পোস্টের দিক দিয়ে গোলে শট নেন বিষ্ণু। পুরো ঘটনাটি এত দ্রুত ও আকস্মিক হয় যে গোলকিপার অমরিন্দর সিং বলের নাগালই পাননি (১-০)।

মরশুমের দ্রুততম গোল হলেও এটি আইএসএলের দ্রুততম গোলের তালিকায় পঞ্চম স্থানে থাকবে। ডেভিড উইলিয়ামস (১২ সেকেন্ড), মাওইমিংথাঙ্গা (২৩), ক্লেটন সিলভা (২৫) ও দাগনালের (৩১) পর।  

এ দিন দিয়েগো মরিসিওকে সামনে রেখে বরাবরের মতো ৪-২-৩-১-এ দল সাজিয়েছিলেন ওডিশার কোচ সের্খিও লোবেরা। গোল খাওয়ার পর তাঁর প্রায় পুরো দলই কার্যত ইস্টবেঙ্গলের অর্ধে উঠে আসে এবং আক্রমণের ঝড় তুলে দেয়। প্রথমার্ধে প্রায় ৭০ শতাংশ বল পজেশন ছিল হোম টিমের। তাদের মোট আটটি শটের মধ্যে চারটি ছিল গোলে। অন্যদিকে, মোট তিনটি শট নেওয়ার সুযোগ পায় ইস্টবেঙ্গল, যার মধ্যে দু’টি ছিল লক্ষ্যে। একটি থেকে গোল করেন বিষ্ণু। 

ওডিশার আগ্রাসী আক্রমণ আটকাতে হিমশিম খেয়ে যান লাল-হলুদ ফুটবলাররা। রয় কৃষ্ণা, আহমেদ জাহু, মরিসিও, ইসাকা রালতে, প্রিন্সটন রেবেলোরা নাগাড়ে আক্রমণ করে গেলেও তাঁদের বারবার আটকে দেন বা পা থেকে বল ছিনিয়ে নেন লাল-হলুদ ডিফেন্ডাররা। কিন্তু নিজেদের দূর্গ বাঁচাতে গিয়ে ৪৫ মিনিটের মধ্যেই আটটি ফাউল করেন তাঁরা। পাঁচটি হলুদ কার্ড দেখেন গোলকিপার গিল-সহ ভিপি সুহের, ক্লেটন সিলভা, মহম্মদ রকিপ ও অজয় ছেত্রী। মাত্র ৪৫ মিনিটের মধ্যেই দুই উইং থেকে মোট ১৬টি ক্রস দেন ওডিশার উইঙ্গাররা। তিনটি অবধারিত গোল সেভ করেন ইস্টবেঙ্গল গোলকিপার গিল। দ্বিতীয়ার্ধে আরও দু’টি গোল বাঁচান তিনি। 

টানা আক্রমণের পর ৩৮ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যে গোলমুখী মরিসিওর পা ধরে তাঁকে ফেলে দেন মহম্মদ রকিপ এবং পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে দেরি করেননি রেফারি। তার আগে অবশ্য রকিপকেই ঠেলে ফেলে দেন মরিসিও। পেনাল্টি স্পট থেকে মরিসিওর গতিময় শট ডানদিক দিয়ে গোলে ঢুকে যায় (১-১)। ঠিক দিকেই ডাইভ দিলেও বলের নাগাল পাননি গিল। এই গোলের পরেও একবার জালে বল জড়িয়ে দেন রয় কৃষ্ণা। কিন্তু তিনি অফসাইডে থাকায় সেই গোল বাতিল হয়ে যায়। 

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মহেশ ও শৌভিককে মাঠে নিয়ে আসে ইস্টবেঙ্গল। তুলে নেওয়া হয় সুহের ও অজয়কে। মহেশ নামার পরে ইস্টবেঙ্গলের আক্রমণে কিছুটা গতি ও ধার বাড়ে। ওডিশার গোলকিপারকে প্রথমার্ধে যেখানে পরীক্ষার মুখে খুব কমই পড়তে হয়, সেখানে দ্বিতীয়ার্ধে তাঁকে দু’টি গোল সেভ করতে দেখা যায়। ৪৯ মিনিটের মাথায় বক্সের মাথা থেকে নেওয়া শৌভিকের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। 

এর পরবর্তী মিনিটেই বক্সের মধ্যে ভিক্টর ভাজকেজকে গোলের বল সাজিয়ে দেন মহেশ। কিন্তু তিনি গোলে শট না নিয়ে ডানদিকে ক্লেটন সিলভাকে দেন। প্রথম টাচেই শট নিলে হয়তো গোল পেতেন ব্রাজিলীয় তারকা। কিন্তু বল ধরে শট নিতে গিয়ে লক্ষ্যভ্রষ্ট হন।  এ দিন ক্লেটন তাঁর চেনা ছন্দে ছিলেন না বলেই হয়তো গোটা দলটাকে প্রথমার্ধে প্রায় অসহায় লাগছিল। দ্বিতীয়ার্ধে মহেশ, নন্দকুমাররা এসে পাল্টা আক্রমণ না করলে হয়তো আরও গোল খেতে হত লাল-হলুদ বাহিনীকে। দুই নবাগত বিদেশী ভাজকেজ ও ফেলিসিও ব্রাউনকে এই ম্যাচেও খুব একটা কার্যকরী মনে হয়নি।    

ইস্টবেঙ্গল আক্রমণে ধার বাড়ালেও ওডিশা ব্যবধান বাড়ানোর জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। ৪৮ মিনিটের মাথাতেই বল নিয়ে বক্সে ঢুকে পড়েন মরিসিও। কিন্তু এ বার তাঁর পা থেকে বল কেড়ে নেন রকিপ। ৫৫ মিনিটের মাথায় বক্সে ঢুকে কাট ব্যাক করে মরিসিওর কাছে বল পাঠানোর চেষ্টা করেন রয় কৃষ্ণা। কিন্তু রয়ের পা থেকে বেরনো বল ক্লিয়ার করে দেন লালচুঙনুঙ্গা। এর পরের মিনিটেই বক্সের মধ্যে নুঙ্গা তাঁকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার পর পেনাল্টির দাবি নিয়ে এতটাই আগ্রাসী হয়ে ওঠেন মরিসিও যে, হলুদ কার্ড দেখেন। 

দুই দলের আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের খেলা জমে ওঠার পর শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যপূরণ করে ওডিশা। জাহুর কর্নারে নীচু হয়ে আসা বলে পা ছুঁইয়ে প্রথম পোস্টের সামনে থেকে জালে বল জড়িয়ে দেন প্রিন্সটন রেবেলো (১-২)। তাঁর মার্কার ভাজকেজ যদি তার আগেই বলের দখল নিয়ে নিতে পারতেন, তা হলে বোধহয় গোল পেতেন না রেবেলো। এর পরে রেবেলোকে আরও একটি গোলের সুযোগ করে দেন রয় কৃষ্ণা। তিনি গোলে শটও নেন। কিন্তু তাঁর দুর্বল শট আটকাতে কোনও সমস্যাই হয়নি গিলের। 

আক্রমণে তীব্রতা আরও বাড়াতে ৬৭ মিনিটের মাথায় বিষ্ণুকে তুলে নন্দকুমারকে নামায় ইস্টবেঙ্গল। সঙ্গে নিশুও নামেন মন্দারের জায়গায়। ৮২ মিনিটের মাথায় কর্নারের পর বক্সের বাঁ দিক থেকে একটি হাওয়ায় বাঁক খাওয়ানো ক্রস পাঠান ভাজকেজ, যা অনেকটা এগিয়ে এসে পাঞ্চ করে বের করে দেন অমরিন্দর। 

৮৪ মিনিটের মাথায় নামেন হরমনজ্যোৎ সিং খাবরা, যিনি শেষ মাঠে নেমেছিলেন ২০২৩-এর ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে, নর্থইস্টের বিরুদ্ধে। স্টপেজ টাইমে বক্সের বাঁ দিক থেকে তিনি একটি মাপা ক্রস পাঠান গোলের সামনে, যা অনুসরণ করে বলের কাছে চলেও আসেন ব্রাউন। কিন্তু তাঁর কাছে বল পৌঁছনোর আগেই তা পাঞ্চ করে বের করে দেন অমরিন্দর। এই মাপা ক্রসের মাধ্যমেই নিজের অভিজ্ঞতার পরিচয় দেন খাবরা। 

ম্যাচের শেষ দিকে বল পজেশন বাড়িয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা শুরু করে ওডিশা এফসি। কিন্তু চেষ্টা ছাড়েনি ইস্টবেঙ্গল। ৮৮ মিনিটের মাথায় বক্সের মাথা থেকে গোলে জোরালো শট নেন মহেশ, যা দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় আটকে দেন অমরিন্দর। ছ’মিনিট বাড়তি সময়ের প্রথম মিনিটে নন্দকুমার বক্সের মধ্যে থেকে গোলের উদ্দেশ্যে নীচু শট নেন। কিন্তু সেই শটে তেমন জোর ছিল না। এত চেষ্টার পরেও অবশ্য সমতা আনতে পারেনি তারা।     

ইস্টবেঙ্গল এফসি দল (৪-১-৪-১): প্রভসুখন গিল (গোল), মহম্মদ রকিপ (হরমনজ্যোৎ খাবরা-৮৪), আলেকজান্দার প্যানটিচ, লালচুঙনুঙ্গা, মন্দার রাও দেশাই (নিশু কুমার-৬৭), অজয় ছেত্রী (শৌভিক চক্রবর্তী-৪৫), পিভি বিষ্ণু (নন্দকুমার শেকর-৬৭), ক্লেটন সিলভা, ভিক্টর ভাজকেজ, ভিপি সুহের (নাওরেম মহেশ সিং-৪৫), ফেলিসিও ব্রাউন। 

পরিসংখ্যানে ম্যাচ

বল পজেশন: ওডিশা এফসি ৬০.৭%  - ইস্টবেঙ্গল এফসি ৩৯.৩% , সফল পাসের হার: ৮৬%-৭৭%, গোলে শট: ৬-৩, ফাউল: ৮-১৩, ইন্টারসেপশন: ২-৩, ক্রস: ২৩-১৪, কর্নার: ৫-৫, হলুদ কার্ড: ৩-৬।

ম্যাচের সেরা: প্রিন্সটন রেবেলো (ওডিশা এফসি)