সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর বিরুদ্ধে ভয়ডরহীন ফুটবলই লক্ষ্য ভারতের

ভারতীয় দলের চলতি দুবাই সফরের প্রথম ম্যাচ যে মেজাজে শেষ করেছিল ভারত, সোমবার সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর বিরুদ্ধে সেই মেজাজটাই ধরে রাখতে চান সন্দেশ ঝিঙ্গন, অমরিন্দর সিংরা। কিন্তু কথাগুলো যতটা সহজে বলা যাচ্ছে, কাজে করে দেখানো কি ততটা সহজ হবে? মোটেই না। বরং একটু বেশিই কঠিন।

ফিফা ক্রমতালিকায় ওমান ভারতের চেয়ে ২৩ ধাপ ওপরে, ৮১ নম্বরে। আর আমিরশাহী কিন্তু আরও ওপরে, ৭৪-এ। তাড়া করোনা আতঙ্ক কাটিয়ে ওমান যেমন সদ্য ফুটবল মাঠে ফিরেছে, আমিরশাহীর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কিন্তু সে রকম নয়। তারা কোভিড-পরবর্তী সময়ে একাধিক ম্যাচ খেলেছে। তাই খেলার মধ্যেই আছে তারা। তাই তাদের বিরুদ্ধে ভাল পারফরম্যান্স দেখানো বেশ কঠিন হবে।

ভয়ডরহীন ফুটবলই মন্ত্র

তবে বিপক্ষে কারা বা তারা কতটা শক্তিশালী, সেসব ভেবে দলের ছেলেদের মাঠে নামতে বারণ করেন ভারতীয় দলের কোচ ইগর স্টিমাচ। ওমানের বিরুদ্ধে ম্যাচের বিরতিতে ভারতীয় ফুটবলারদের যে কথাগুলো বলেছিলেন তিনি, এই ম্যাচের আগেও সে কথাই বলছেন তাঁর খেলোয়াড়দের, ম্যাচের ফল নিয়ে তোমাদের কিছু ভাবতে হবে না। ওটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। তোমরা নির্ভয়ে খেলে যাও। সেই ভয়ডরহীন ফুটবলই এই ম্যাচেও মূলমন্ত্র ভারতীয় দলের।

ওমানের বিরুদ্ধে প্রথমার্ধে জড়তা কাটাতে পারেনি একঝাঁক নতুন ফুটবলারকে নিয়ে গড়া ভারতীয় দল। সে দিন প্রথম দলে ৬ জনের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় ও দ্বিতীয়ার্ধে পরিবর্ত হিসেবে আরও চারজনের প্রথম ভারতের সিনিয়র দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার স্বপ্ন সফল হয়। এঁরা সবাই এ বারের হিরো আইএসএলে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে ভারতীয় দলে ডাক পেয়েছেন। স্টিমাচ যা নিয়ে আগেই বলেছিলেন, প্রত্যেকেই নিজেদের প্রমাণ করে ভারতীয় শিবিরে ডাক পেয়েছে। ওরা প্রত্যেকেই এই জায়গাটা অর্জন করেছে

সে দিন ওমানের বিরুদ্ধে ম্যাচে প্রথমার্ধে যে জড়তা ছিল, তা দ্বিতীয়ার্ধে কাটিয়ে নিজেদের স্বাভাবিক পারফরম্যান্সে ফিরে আসে ভারতীয় দল। যার ফল ওই ১-১ ড্র। হিরো আইএসএল ফাইনালে জয়সূচক গোলদাতা মুম্বই সিটি এফসি-র বিপিন সিংয়ের সহায়তায় অসাধারণ হেডে গোল শোধ করেন এটিকে মোহনবাগানের সফল ফরোয়ার্ড মনবীর সিং। এ বারের হিরো আইএসএলে ভারতীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় সুনীল ছেত্রীর পরেই ছিলেন যিনি।

ফল নয়, ভাল ফুটবল চাই

ক্রোয়েশিয়ান কোচ স্টিমাচ এই ম্যাচের আগেও বরাবর বলে এসেছেন, এই দুবাই সফরে আমি ম্যাচের ফল নিয়ে ভাবছি না। ছেলেরা কেমন খেলবে, তারা শক্তিশালী দলের বিরুদ্ধে কতটা অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারবে, এই নিয়েই বেশি ভাবছি। সোমবারের ম্যাচেও সেটাই গুরুত্বপূর্ণ ক্রোয়েশিয়ার প্রাক্তন বিশ্বকাপারের কাছে। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরে তাঁর দলের ছেলেরা কতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামতে পারছেন ও সেই আত্মবিশ্বাস কতটা কাজে লাগাতে পারছেন, সেটাই স্টিমাচের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সে দিক থেকে দেখতে গেলে প্রথম ম্যাচে ভারতীয় দল অনেকটা সফল। পুরোটা না হোক, অন্তত অর্ধেক ম্যাচে যথেষ্ট লড়াকু মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন তাঁরা। তাও একঝাঁক অনভিজ্ঞ ফুটবলার নিয়ে।       

সোমবারের ম্যাচেও দলের ছেলেদের কাছে এমনই ফুটবল চান স্টিমাচ। ওমানের বিরুদ্ধে মোট ১৭জন ফুটবলারকে খেলিয়েছেন তিনি। বাকি রয়েছেন দশজন। তাঁদেরও আমিরশাহীর বিরুদ্ধে মাঠে নামিয়ে দেখে নিতে চান। জুনে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ম্যাচে এই অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস যথেষ্ট কাজে লাগবে বলেই মনে হয় কোচের।

তাঁর মতে, ক্রমতালিকায় প্রথম একশোর মধ্যে ২৫-৩০-এর ফারাক মানে অনেক। আমিরশাহীর সঙ্গে আমাদের ফারাক ৩০ ধাপের। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তাদের বিরুদ্ধে কোনও ফল পাওয়া যাবে না। আমিরশাহীর বিরুদ্ধে ভারত শেষবার খেলেছিল ২০১৯-এ এএফসি এশিয়ান কাপে। সেই ম্যাচে ২-০ জিতেছিল আমিরশাহী। এই ম্যাচটা ওমানের বিরুদ্ধে ম্যাচের চেয়ে অনেক আলাদা হবে বলে মনে করেন স্টিমাচ। তিনি এআইএফএফ মিডিয়াকে বলেন, আমিরশাহীর বিরুদ্ধে ম্যাচটা অন্যরকম হবে। এই ম্যাচে অন্য খেলোয়াড়দেরও সুযোগ দিতে হবে। জুনে আমাদের (বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে) গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আছে। তার আগে ছেলেদের সবাইকে দেখে নিতে চাই। অর্থাৎ প্রথম বেশ কিছু পরিবর্তন করে দল নামাতে চান ভারতীয় দলের কোচ।

শারীরিক, মানসিক উন্নতি চাই  

দলের গোলকিপার ও হিরো আইএসএল চ্যাম্পিয়ন মুম্বই সিটি এফসি দলের সদস্য অমরিন্দর সিং, যিনি ওমানের বিরুদ্ধে পেনাল্টি বাঁচিয়ে ভারতীয় দলকে বিপদের হাত থেকে বাঁচান, তিনি বলছেন, ভারতীয় ফুটবলে এখন ইতিবাচক ঘটনা ঘটছে। এক ঝাঁক তরুণ প্রতিভা উঠে আসছে, যেটা খুবই দরকার। একই ম্যাচে একসঙ্গে ১০ জনের আন্তর্জাতিক অভিষেক আর কোন দলে দেখা গিয়েছে? এই অভিজ্ঞতাটা ওদের আরও উন্নত করে তুলতে সাহায্য করবে

যে দুটি বিষয়ে আরও উন্নতি করে হবে তাঁদের, তা নিয়ে অমরিন্দর বলেছেন, শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে এখনও পিছিয়ে রয়েছি আমরা। আন্তর্জাতিক ফুটবলে যে কোনও ভাল দলের বিরুদ্ধে ভাল খেলতে হলে এই দুটো ব্যাপারে আরও উন্নতি করা দরকার। আরব আমিরশাহীও শারীরিক দিক থেকে এগিয়ে। এই ম্যাচে আমরা যত কম ভুল করব, তত আমাদের সাফল্যের সম্ভাবনা বাড়বে

গত ম্যাচে ভারতের গোলদাতা মনবীরের বক্তব্য, ওমানের রক্ষণ এতটা সঙ্ঘবদ্ধ ছিল যে ওদের সেই রক্ষণ ভেদ করে গোল করা বেশ কষ্টকর ছিল। তাই যখন বিপিন বলটা পেল, তখন আমি সঠিক জায়গায় পৌঁছে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠি। ওর যেমন নিখুঁত কাজ করেছে, আমিও সে ভাবেই বলটা মাথা দিয়ে গোল ঠেলে দিই। এই গোলটাই পরের ম্যাচের জন্য তাঁকে ও সতীর্থেদের অনেক আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছে বলে মনে করেন পঞ্জাবের ফরোয়ার্ড।

আসন্ন ম্যাচ নিয়ে মনবীর বলেন, ওমানের বিরুদ্ধে ড্রয়ের ফলে আমাদের আত্মবিশ্বাসের স্তর অনেকটা ওপরে উঠে গিয়েছে। আমিরশাহী নিজেদের ঘরের মাঠে খেলবে। যদিও গ্যালারিতে সমর্থকেরা থাকবেন না। কিন্তু তা সত্ত্বেও চেনা পরিবেশের সুবিধাটা ওরা ভরপুর পাবে। মানসিক ভাবে হয়তো ওরা এগিয়ে থেকেই নামবে। কিন্তু যতক্ষণ না ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজছে, ততক্ষণ কিছুই বলা যায় না

সফল, তবে ধারাবাহিক নয়

২০১৯ থেকে আমিরশাহী দলের কোচের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন ডাচ কোচ বার্ট ফান মারউইক। আগামী বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব তারা মালয়শিয়ার বিরুদ্ধে ২-১ জয় দিয়ে শুরু করে ও ইন্দোনেশিয়াকে ৫-০ গোলে হারায়। কিন্তু তাইল্যান্ডের কাছে ১-২ ও ভিয়েতনামের বিরুদ্ধে ০-১ হেরে যায়। বাছাই পর্বে এখনও আরও কয়েকটি ম্যাচ বাকি রয়েছে তাদের। আরবিয়ান গালফ্ কাপে ইরাক, কাতার ও ইয়েমেনের কাছে হেরে প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় ১৯৯০ বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলা দেশটি।

করোনা পর্বের পরে একাধিক ফ্রেন্ডলি ম্যাচ খেলে তারা। উজবেকিস্তানের কাছে ১-২ হারলেও তাজিকিস্তানের বিরুদ্ধে ৩-২ জেতে আমিরশাহী। এর পরে বাহারিনের কাছে ১-৩ হার ও এ বছর জানুয়ারিতে ইরাকের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র হয় তাদের ম্যাচ। অর্থাৎ ৩০ ধাপ ওপরে থাকলেও তারা যে অপ্রতিরোধ্য, এ কথা বলা যায় না। ধারাবাহিকতারও অভাব রয়েছে মারউইকের দলের।

নজরে মবখৌত

ভারতের বিরুদ্ধে আবার দুই নির্ভরযোগ্য মিডফিল্ডার আবদুল্লা আল নকবি ও কেয়ো কানেডো চোটের জন্য খেলতে পারবেন না। ফরোয়ার্ড আলি মবখৌত অবশ্য সমস্যায় ফেলতে পারেন ভারতীয় রক্ষণকে। যেমন ফেলেছিলেন ২০১৯-এর এশিয়ান কাপের ম্যাচে। ২-০ জয়ে একটি গোল ছিল তাঁর। চলতি বাছাই পর্বে ছটি গোল রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ইন্দোনেশিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকও করেন তিনি। সব মিলিয়ে ৬০টি আন্তর্জাতিক গোল আছে তাঁর, যা আজ পর্যন্ত তাঁর দেশের আরও কোনও ফুটবলারেরই নেই। সোমবারও এই ফরোয়ার্ডকে নজরে রাখতেই হবে সন্দেশ ঝিঙ্গনদের।     

এ পর্যন্ত ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর মধ্যে ১৪টি ম্যাচ হয়েছে। তার মধ্যে দুটিতে জিতেছে ভারত ও নটিতে আমিরশাহী। তিনটি ড্র হয়েছে। ১৯৮১-তে মালয়েশিয়ায় মারডেকা কাপে ভারত জিতেছিল ২-০-য়। সেটাই আমিরশাহীর বিরুদ্ধে ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যবধানে জয়। ২০১৪-র বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে দিল্লিতে ০-২ পিছিয়ে পড়া সত্ত্বেও ২-২ ড্র করেছিল ভারত। জেজে লালপেখলুয়া ও গৌরমাঙ্গি সিং গোল দুটি করেছিলেন।

ভারতীয় দল:

গোলকিপার – গুরপ্রীত সিং সান্ধু, অমরিন্দর সিং, শুভাশিস রায়চৌধুরী, ধীরজ সিং,

ডিফেন্ডার – আশুতোষ মেহতা, আকাশ মিশ্র, প্রীতম কোটাল, সন্দেশ ঝিঙ্গন, চিঙলেনসানা সিং, আদিল খান, মন্দার রাও দেশাই, মাশুর শেরিফ,

মিডফিল্ডার – রাওলিন বোর্জেস, লালেঙমাওউইয়া, জিকসন সিং, রেইনিয়ে ফার্নান্ডেজ, অনিরুদ্ধ থাপা, বিপিন সিং, ইয়াসির মহম্মদ, সুরেশ সিং, হালিচরণ নার্জারি, লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে, আশিক কুরুনিয়েন,

ফরোয়ার্ড – মনবীর সিং, ইশান পন্ডিতা, হিতেশ শর্মা, লিস্টন কোলাসো।

ম্যাচ: ভারত বনাম সংযুক্ত আরব আমিরশাহী (ফ্রেন্ডলি)

স্থান: জাবিল স্টেডিয়াম, দুবাই

তারিখ: ২৯ মার্চ, ২০২১

কিক-অফ: রাত ৮.৩০ (ভারতীয় সময়)

Your Comments

Your Comments