নতুন ইতিহাসের দোরগোড়ায় ভারতীয় ফুটবল দল। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডের দরজা খুলতে আর একটি জয় প্রয়োজন তাদের। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কলকাতার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সেই ম্যাচ খেলতে নামছেন শুভাশিস বোসরা, যা আবার সুনীল ছেত্রীরও শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। দু’দিক থেকে গুরুত্বপূ্র্ণ এই ম্যাচে জিতে মাঠ ছাড়ার ব্যাপারে যে মরিয়া ভারতীয় শিবির, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

মে-র শুরুতে ইন্ডিয়ান সুপার লিগ ২০২৩-২৪ শেষ হওয়ার পর তিন সপ্তাহের প্রস্তুতি শিবিরে নিজেদের তরতাজা ও প্রস্তুত করে নিয়েছেন ভারতীয় দলের ২৭জন ফুটবলার। এ বার মাঠে নেমে কুয়েতকে হারিয়ে নতুন ইতিহাস তৈরির সুযোগ তাদের সামনে। শুধু মাইলফলক প্রতিষ্ঠা করাটাই তাদের প্রেরণা নয়, দেশের ফুটবলের সেরা কিংবদন্তি ও এ প্রজন্মের ফুটবলারদের আদর্শ সুনীল ছেত্রীর বিদায়ী ম্যাচকে স্মরণীয় করাও তাদের লক্ষ্য। ফলে একসঙ্গে দু’টি লক্ষ্যকে সামনে রেখে বৃহস্পতিবার যুবভারতীতে নামবেন লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে, মনবীর সিংরা।

এশীয় বাছাই পর্বের গ্রুপ ‘এ’-তে রয়েছে ভারত। প্রতি গ্রুপ থেকে দুটি করে দল তৃতীয় রাউন্ডে উঠবে। আপাতত চার ম্যাচে চার পয়েন্ট পেয়ে দু’নম্বরে রয়েছে ভারত। তিন পয়েন্ট পেয়ে কুয়েত চারে, আফগানিস্তানের পরে। গোলপার্থক্যে ভারত (-৩) এগিয়ে রয়েছে আফগানিস্তানের (-১০) চেয়ে। ফলে যুবভারতীতে দ্বিতীয় জয় অর্জন করে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে ভারতের। তৃতীয় রাউন্ডে উঠলে টানা তৃতীয়বার এএফসি এশিয়ান কাপের মূলপর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে ভারত। এই ঘটনাও ঘটবে প্রথমবার।

বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে দ্বিতীয় রাউন্ডে মোট ৩৬টি দলকে ৯টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছে। প্রতি গ্রুপে রয়েছে চারটি দল। তৃতীয় রাউন্ডে ১৮টি দলকে তিনটি গ্রুপে ভাগ করা হবে, যেখানে প্রতি গ্রুপে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে পদ্ধতিতে খেলা হবে। ভারত এখন সেই দিকে তাকিয়ে।

পয়া যুবভারতী

ভারতীয় দলের ক্রোয়েশিয়ান কোচ ইগর স্টিমাচের আশা, বৃহস্পতিবার যুবভারতীর গ্যালারি ভরে উঠবে এবং তাঁরা সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে সাফল্য উদযাপন করতে পারবেন, “এই ম্যাচ যেহেতু খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এই ম্যাচ জিতে যেহেতু আমাদের সামনে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডে উঠে ইতিহাস তৈরি করার সুযোগ আছে এবং যেহেতু এটা দেশের হয়ে সুনীল ছেত্রীর শেষ ম্যাচ, তাই আশা করি সল্ট লেক স্টেডিয়ামের গ্যালারি পরিপূর্ণ থাকবে। আশা করি, আমাদের ছেলেদের জেতাতে ও সুনীলকে বিদায় জানাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সমর্থকেরা সেদিন কলকাতায় আসবেন”। কোচ জেনে খুশি হতে পারেন, ম্যাচের সব টিকিট শেষ বলে জানিয়েছে সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন।

যুবভারতী স্টিমাচের ভারতের কাছে পয়া মাঠ বলা যায়। ২০২২-এর জুনে এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে এই মাঠেই টানা তিনটি ম্যাচে জয় পেয়েছিল ভারত। হারিয়েছিল কম্বোডিয়া (২-০), আফগানিস্তান (২-১) ও হংকং-কে (৪-০)। ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীরা জেনে খুশি হতে পারেন, এই স্টেডিয়ামে ২০০৬-এর অগাস্টে এশিয়ান কাপ বাছাই পর্বে সৌদি আরবের কাছে ০-২ হারের পর আর কোনও ম্যাচে হারের মুখ দেখেনি ভারত। তাই কুয়েতের বিরুদ্ধে ম্যাচটি কলকাতাতেই খেলতে চেয়েছিলেন স্টিমাচ।

দলের বঙ্গতারকা ডিফেন্ডার শুভাশিস বোসের মতে, “এই ম্যাচের আগে আমাদের মোটিভেশন লেভেল সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডে উঠে ইতিহাস তৈরির লক্ষ্য তো আছেই। এ ছাড়া আমরা সবাই জানি যে, এটাই ভারতের হয়ে সুনীল ভাইয়ের শেষ ম্যাচ। তাই এই ম্যাচকে স্মরণীয় করে রাখতে চাই আমরা। ওকে একটা ভাল বিদায়ী উপহার দেওয়ার জন্য এই ম্যাচটা জিততে চাই আমরা”।

অধিনায়ক সুনীল ছেত্রীর মতে, "আবেগ দিয়ে এই ম্যাচটা নিয়ে ভাবার চেষ্টা করছি না। এই ম্যাচটা আমার জন্য নয়। ১-০ য় জিতলে মন্দ হবে না। সে যেই গোল করুক। গত ১৫ দিন আমাদের ভালই কেটেছে। ফিটনেসের দিক থেকে দলের সবাই একই জায়গায় রয়েছে। এটা কোচের কাছে একটা মাথাব্যথা হয়ে উঠতে পারে, যেটা খুবই ভাল"

ঘরের মাঠে বেনজির ফল

গত বছরে ভারত ঘরের মাঠে ১১টি ম্যাচ খেলে। তার মধ্যে ন’টিতে জেতে এবং দু’টিতে ড্র করে। অর্থাৎ এই বছরে ঘরের মাঠে হারের মুখে দেখেনি ক্রোয়েশিয়ান কোচ ইগর স্টিমাচের প্রশিক্ষণাধীন ভারত। টানা আটটি ম্যাচে গোল খায়নি তারা। তিনটি চ্যাম্পিয়নশিপ খেতাবও জেতে। এমন ধারাবাহিকতা অনেকদিন দেখেনি ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীরা। এই ধারাবাহিকতার ফলে ফিফার বিশ্ব ক্রমতালিকায় ৯৯ নম্বরেও উঠে আসে ভারত।

কিন্তু দেশের বাইরে বেরিয়ে তাদের দুর্বলতা ফের ফুটে ওঠে। প্রথমে সেপ্টেম্বরে থাইল্যান্ডে কিংস কাপে ও পরে কুয়ালালামপুরে অক্টোবরে মারডেকা কাপে কোনও ম্যাচেই জিততে পারেনি তারা। এএফসি এশিয়ান কাপেও দু’টি ম্যাচে তারা হারে। একটিতেও কোনও গোল করতে পারেনি তারা। গোল করতে না পারার এই সমস্যা চিন্তায় রেখেছে স্টিমাচকে। তাই গত তিন সপ্তাহে দলের এই সমস্যা সমাধানে বিশেষ জোর দেন তিনি।

সুনীলদের কোচ বলেন, “প্রস্তুতি শিবিরে ছেলেরা ভালই অনুশীলন করছে। এই শিবিরে খেলার বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করেছি আমরা। আক্রমণ ও রক্ষণ— দুই দিকই। আমাদের ছেলেরা ফিটনেসে প্রতিদিন ক্রমশ উন্নতি করেছে। তার পরে আমরা কৌশল নিয়ে কাজ শুরু করি। শেষ এক সপ্তাহে পজিশনিং, সেট পিস ও ট্রানজিশন নিয়ে কাজ হয়েছে”।
চলতি বাছাই পর্বে কুয়েতকে তাদের হোম ম্যাচে হারিয়ে এসেছে ভারত। যদিও দেশের মাঠে কাতারের কাছে হেরেছে। আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্র-ও করেছেন সুনীলরা। ফলে এই ম্যাচে কুয়েতকে হারাতে পারলে ও অপর ম্যাচে বৃহস্পতিবারই কাতার যদি আফগানিস্তানকে হারায়, তা হলে ভারতের তৃতীয় রাউন্ডে ওঠার রাস্তা পরিস্কার হয়ে যাবে।

চেনা প্রতিপক্ষ

গত বছর জুলাইয়ে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে কুয়েতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় স্টিমাচের ভারত। এর আগে আটবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হলেও কুয়েতের মতো শক্তিশালী দলকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়নি তারা। এর আগে ২০১০-এ ফ্রেন্ডলি ম্যাচে ৯-১-এ ভারতকে হারিয়েছিল এই পশ্চিম এশীয় দেশ। তার আগে ১৯৭৮-এর এশিয়ান গেমসে ৬-১-এ জেতে কুয়েত। সেই সব দিনের তুলনায় যে দেশের ফুটবল অনেক এগিয়ে গিয়েছে, এই সাফল্য তা-ই প্রমাণ করেছে। কিন্তু এ বার কুয়েতকে হারিয়ে বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডে উঠতে পারলে সেটা হবে ভারতীয় ফুটবলের উন্নতির একটা উল্লেখযোগ্য সূচক।

নভেম্বরে কুয়েতের ঘরের মাঠে তাদের বিরুদ্ধে রীতিমতো দাপুটে ফুটবল খেলে জয় দিয়ে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের অভিযান শুরু করে ভারত। সেই ম্যাচে ১-০-য় জিতে প্রথম ম্যাচেই তিন পয়েন্ট অর্জন করে তারা। কুয়েত সিটির জাবের আল আহমাদ স্টেডিয়ামে সে দিন মনবীর সিংয়ের গোলে বহু প্রতীক্ষিত জয় পান সুনীল ছেত্রীরা। কিন্তু তার পর থেকে টানা ছ’টি ম্যাচে জয় পায়নি ভারত। এমনকী ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধেও না। ফলে ফিফার বিশ্ব ক্রমতালিকায় তারা ১২১-এ নেমে যায়।

জয়হীন কুয়েত

কুয়েতের সাম্প্রতিক ফলও ইতিবাচক নয়। চলতি বছরে যে চারটি ম্যাচ খেলেছে, তার কোনওটিতেই জিততে পারেনি কোচ রুই বেনতোর প্রশিক্ষণাধীন দলটি। চলতি বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে কাতারের কাছে দু’টি ম্যাচেই হারে তারা (ফল ০-৩ ও ১-২)। এ ছাড়া লিবিয়া (১-৩) ও উগান্ডার (০-২) বিরুদ্ধেও ফ্রেন্ডলি ম্যাচে হারে কুয়েত। টানা ব্যর্থতার ফলে ফিফা ক্রলতালিকায় ১৩৯ নম্বরে নেমে আসে তারা।

ভারতের বিরুদ্ধে ম্যাচের জন্য যে ২৬ জনের দল ঘোষণা করেছে তারা, তার মধ্যে ২০জনই দেশের সেরা তিন ক্লাব কুয়েত এসসি, আল আরাবি এসসি ও আল কাদসিয়া এসসি-র হয়ে খেলেন। দলের ফুটবলাররা টেকনিকে যথেষ্ট উন্নত এবং আক্রমণ ও ট্রানজিশনে যথেষ্ট গতিময়। সুনীল ছেত্রীর মতে, “এই ম্যাচে কোনও দলই কোনও চমক দেখাতে পারবে বলে মনে হয় না আমার। কারণ, দুই দলই একে অপরকে ভাল ভাবে জানে”।

সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে কুয়েতের গোলদাতা, নির্ভরযোগ্য উইঙ্গার শাবাইব আল খলদিকে এই ম্যাচে পাচ্ছে না কুয়েত। তবে ডিফেন্ডার খালিদ এল এব্রাহিম, তিন মিডফিল্ডার আহমেদ আল দেফিরি, সুলতান এল এনিজি ও ইদ আল রশিদি এবং ফরোয়ার্ড মোবারক আল ফানিনি সমস্যায় ফেলতে পারে সুনীল ছেত্রীদের।

ধারালো ছেত্রী-বাহিনী

কুয়েতের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে কোচ বলেন, “গত এক বছরে কুয়েতের বিরুদ্ধে যে তিনটি ম্যাচ খেলেছি আমরা, প্রতিটিই বেশ কঠিন ছিল। কিন্তু আমরা প্রতিটি ম্যাচই দারুন ভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছি। শারীরীক ভাবেও আমরা ওদের চেয়ে এগিয়ে ছিলাম। কিন্তু এটাও ঠিক যে কুয়েতের বিরুদ্ধে সেই ম্যাচগুলির আগে আমরা একাধিক ভাল ম্যাচ খেলেছিলাম। সেগুলোই আমাদের আরও ভাল মানের ফুটবল খেলতে সাহায্য করেছিল”।

এ বার সম্প্রতি তেমন কোনও ম্যাচ ভারতীয় দল খেলেনি ঠিকই। কিন্তু প্রায় এক মাস প্রস্তুতি শিবিরে নিজেদের ঘষেমেজে উন্নত করে তুলেছে তারা। আইএসএলে দুরন্ত ফর্মে থাকা লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে ও বিক্রমপ্রতাপ সিং ছাড়াও মনবীর সিং, নন্দকুমার সেকর, লিস্টন কোলাসো, নাওরেম মহেশ সিং-রা ভারতের আক্রমণের সেরা অস্ত্র হয়ে উঠতে পারেন। দূর্গরক্ষার জন্য আনোয়ার আলি, জয় গুপ্তা, মেহতাব সিং, রাহুল ভেকে, শুভাশিস বোসদের ওপর ভরসা করতে হবে স্টিমাচকে।

গোল সামলানোর জন্য গুরপ্রীত সিং সান্ধু, অমরিন্দর সিং ও বিশাল কয়েথের মধ্যে কাকে বাছবেন তিনি, সেটাই দেখার। তবে যে ফুটবলারদের নিয়ে দল গড়েছেন স্টিমাচ, তাঁরা যদি নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলতে পারেন, তা হলে এই ম্যাচ জিতে ইতিহাস গড়তে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় ভারতের।

ম্যাচ: ভারত বনাম কুয়েত

টুর্নামেন্ট: বিশ্বকাপ বাছাই পর্ব, এশীয় অঞ্চল, দ্বিতীয় রাউন্ড

ভেনু: বিবেকানন্দ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গন, কলকাতা

কিক অফ: ৬ জুন, সন্ধ্যা ৭.০০

সম্প্রচার: স্পোর্টস ১৮, জিও সিনেমা