প্রায় শেষ হতে চলেছে আইএসএলের দশম মরশুমও। যা মনে রাখবে ভারতীয় ফুটবল মহল। কারণ, এ বার দেশের এক নম্বর ফুটবল লিগে ভারতীয় ফুটবলারদের করা গোলের সংখ্যা অন্যান্য বারের তুলনায় সবচেয়ে বেশি। লিগ পর্বে যে ৩৫২টি গোল হয়েছে, তার মধ্যে ১২৩টি করেছেন ভারতীয় ফুটবলাররা। তিনজন ভারতীয় তারকা তাঁদের দলের দশটিরও বেশি গোলে অবদান রেখেছেন, যা এর আগে কোনও মরশুমে দেখা যায়নি। ভারতীয় ফুটবলাররা যে ক্রমশ গোল করার ব্যাপারে পারদর্শী হয়ে উঠছেন, এ তারই প্রমাণ। দেখে নেওয়া যাক এ মরশুমের লিগ পর্যায়ে সেরা পাঁচ ভারতীয় তারকা কারা।

লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে, মুম্বই সিটি এফসি

গত দু’মরশুম ধরেই এ দেশের অন্যতম সেরা উইঙ্গারের জায়গাটা ধরে রেখেছেন লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে। তবে এ বারে তিনি একধাপ এগিয়েই গিয়েছেন। এ বার দলের ১৩টি গোলে অবদান রেখেছেন তিনি। সাতটি গোল নিজে করেছেন ও ছ’টি করিয়েছেন। ভারতীয় ফুটবলারদের মধ্যে তাঁর গোল অবদানই সবচেয়ে বেশি। অন্যদের মধ্যে বিক্রম প্রতাপ সিং দশটি গোলে অবদান রেখেছেন এবং মোনবাগানের মনবীর সিংও একই সংখ্যক গোলে অবদান রেখেছেন। মুম্বই সিটি এফসি-র প্লে অফে ওঠার পিছনে ছাঙতের অবদান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।

সব মিলিয়ে ৩৫টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি, যা মনবীরের চেয়ে দু’টি বেশি। অবশ্য ব্র্যান্ডন ফার্নান্ডেজের (৫৬) চেয়ে পিছিয়ে রয়েছেন তিনি। ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোলও তাঁরই। তবে একই কৃতিত্ব দাবি করতে পারেন তাঁর সতীর্থ বিক্রমপ্রতাপও। এ মরশুমে এ পর্যন্ত প্রতিপক্ষের বক্সে মোট ৯৯বার বল ছুঁয়েছেন ২৬ বছর বয়সী এই উইঙ্গার। এই ব্যাপারে তিনি নোয়া সাদাউই (১৪৬) ও কার্লোস মার্তিনেজের (১০১) পরেই রয়েছেন ছাঙতে। ড্রিবলের সংখ্যাতেও (৬৭) তিনি ভারতীয়দের মধ্যে দু’নম্বরে রয়েছেন, জিথিন এমএসের (৭০) পরেই। এর মধ্যে তাঁর ৩০টি ড্রিবল সফল হয়েছে।

বিক্রম প্রতাপ সিং, মুম্বই সিটি এফসি

এ বারের আইএসএলের নয়া আবিষ্কার বলা যেতে পারে বিক্রম প্রতাপ সিংকে। যদিও এই নিয়ে আইএসএলে চতুর্থ মরশুম খেলছেন তিনি। তবে এ বারের মতো উন্নত পারফরম্যান্স আর কোনও বার দেখা যায়নি। লিগ পর্বে মোট সাতটি গোল করেছেন তিনি। অ্যাসিস্ট করেছেন তিনটিতে। ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গোল তাঁর ও ছাঙতের। দলের গোল অবদানে ভারতীয়দের মধ্যে ছাঙতের পরেই তিনি। সাতটি গোলই তিনি করেছেন বক্সের মধ্যে থেকে, যা এক রেকর্ড। যতক্ষণ মাঠে ছিলেন, তাতে প্রতি ১৫৩ মিনিট অন্তর একটি করে গোল করেছেন তিনি। আইএসএলের ইতিহাসে আর কোনও ভারতীয় এত ঘন ঘন গোল করতে পারেননি।

শট কনভারশন রেটেও তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে। তাঁর লক্ষ্যে থাকা শটের ২১.৯% গোলে পরিণত করতে পেরেছেন বিক্রম, যা আজ পর্যন্ত কোনও ভারতীয় (যারা অন্তত দশটি শট গোলে রেখেছেন) এই লিগে করতে পারেননি। এ বারের লিগে একটি হ্যাটট্রিকও রয়েছে তাঁর, যা তিনি করেন গত মাসে নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে। ২১ বছর ৭৩ দিন বয়সে হ্যাটট্রিক করেছিলেন মোহনবাগানের কিয়ান নাসিরি। বিক্রম হ্যাটট্রিক করেন ২২ বছর ৫৬দিন বয়সে। অর্থাৎ, এই ব্যাপারে কিয়ানের পরেই রয়েছেন তিনি।   

মনবীর সিং, মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট

বেশি গোল করতে না পারলেও যে ভাবে একের পর এক গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি, তাতে মনবীর সিংকে এখন অনেকেই ভারতীয়দের মধ্যে অন্যতম সেরা কার্যকরী খেলোয়াড় বলে আখ্যা দিচ্ছেন। এ বারের লিগে নিজে তিনটি গোল করেছেন ও সাতটি গোলে প্রত্যক্ষ মদত দিয়েছেন মনবীর সিং, যা তাঁর আইএসএল কেরিয়ারের মোট (১৫) অ্যাসিস্টের প্রায় অর্ধেক।

এই মরশুমে তিনি সব মিলিয়ে ৩৩টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, যা তাঁর দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা দিমিত্রিয়স পেট্রাটসের (৫২) পরেই। সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগ তৈরি করা ভারতীয় ফুটবলারদের তালিকায় মনবীর রয়েছেন চার নম্বরে। লিগ পর্বে প্রতিপক্ষের বক্সে তিনি ৯২ বার বলে পা লাগিয়েছেন। এই ব্যাপারে ভারতীয়দের মধ্যে তিনি ছাঙতের পরেই রয়েছেন এবং সব মিলিয়ে পাঁচ নম্বরে রয়েছেন। এই ব্যাপারে সবুজ-মেরুন শিবিরে জেসন কামিংসের (৮০) ঠিক ওপরেই রয়েছেন তিনি।    

শুভাশিস বোস, মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট

এই নিয়ে আইএসএলে সাত নম্বর মরশুমে খেলছেন ২৮ বছর বয়সী শুভাশিস বোস। অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার এ বারের লিগে যতটা সময় মাঠে ছিলেন, আর কোনও ফুটবলারই (আউটফিল্ডার) এত সময় মাঠে থাকতে পারেননি। সব মিলিয়ে ১৯৪২ মিনিট মাঠে ছিলেন তিনি। তার চেয়ে বেশি মাত্র দু’জন ম্যাচটাইম পেয়েছেন, দুজনই গোলকিপার বিশাল কয়েথ (১৯৮০) ও গুরপ্রীত সিং সান্ধু (১৯৮০)।

শুভাশিস শুধু যে রক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তা নয়, আক্রমণেও যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। সব মিলিয়ে ১০৯৯টি পাস খেলেছেন শুভাশিস। ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাস করেছেন তিনিই। যার মধ্যে ৮৫৩টি ছিল সফল পাস এবং ১৯৯টি পাস ছিল ফাইনাল থার্ডে। সফল পাসের ক্ষেত্রে তিনি ভারতীয়দের মধ্যে রয়েছেন দু’নম্বরে, চিংলেনসানা সিংয়ের (৮৫৬) পরেই। ফাইনাল থার্ডে বাড়ানো পাসের সংখ্যাতেও তিনি দুই নম্বরে, জয় গুপ্তার (২১৮) পরেই। ৫৭টি ট্যাকল ও ২১টি ব্লক করেছেন তিনি। একাধিক অবধারিত গোলও বাঁচিয়েছেন। তাঁর চেয়ে বেশি ট্যাকল এ বারের লিগে আর কেউ করেননি। এর মধ্যে ৩২টিতে তিনি সাফল্য পেয়েছেন। তাঁর ২১টি ব্লকও এ মরশুমে ভারতীয়দের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং সব মিলিয়ে তৃতীয়, রায়ান এডওয়ার্ডস (২৮) ও হিজাজি মাহেরের (২২) পরেই।

ব্র্যান্ডন ফার্নান্ডেজ, এফসি গোয়া

এই মরশুমে তিনি খুব বেশি অ্যাসিস্ট করতে পারেননি ঠিকই, মাত্র চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন। কিন্তু এ মরশুমে তিনি আইএসএল কেরিয়ারে ২৫টি অ্যাসিস্টের মাইলফলক পেরিয়ে এসেছেন, যা ভারতীয়দের মধ্যে প্রথম। তবে দলের হয়ে যে পরিমান গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন, তা উল্লেখযোগ্য। এ মরশুমে ৫৪টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। আর কোনও ভারতীয় ফুটবলার এত গোলের সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। একমাত্র মাদি তালাল (৫৭) তাঁর চেয়ে বেশি সুযোগ তৈরি করতে পেরেছেন। পেট্রাটস ৫২টি এবং আহমেদ জাহু ও রাফায়েল ক্রিভেলারো ৪২টি করে সুযোগ তৈরি করেছেন।

প্রতিপক্ষের পেনাল্টি এরিয়ায় প্রবেশ করার ক্ষেত্রেও তিনি ভারতীয়দের মধ্যে সবার আগে। মোট ১৬৭ বার পেনাল্টি এরিয়ায় প্রবেশ করেছেন, যা এই তালিকায় চার নম্বরে। এ মরশুমে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি সফল ক্রস সরবরাহের তালিকাতেও তিনি রয়েছেন দু’নম্বরে। মোট ৪১টি সফল ক্রস তুলেছেন ব্র্যান্ডন, যা পেট্রাটসের ৪২টি সফল ক্রসের পরেই। তাঁর মোট ১৩৩টি ক্রসের চেষ্টাও রয়েছে পেট্রাটস (১৪৩) ও রাফায়েল ক্রিভেলারোর (১৩৬) পরেই।