আট-ন’মাসের কঠোর ও শৃঙ্খলাবদ্ধ পরিশ্রমের ফল পেয়েছেন তাঁরা। ইন্ডিয়ান সুপার লিগ শিল্ড। এ বার মোহনবাগানের তারকা ফুটবলারদের একটাই লক্ষ্য আইএসএলের কাপও জেতা, যা তারা গত বছরেও জিতেছিল। একই মরশুমে শিল্ড ও কাপ জিতলে তা হবে আর এক নজির। সেই নজির গড়াই এখন লক্ষ্য দিমিত্রিয়স পেট্রাটস, জেসম কামিংসদের। 

সোমবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে লিগের শেষ ম্যাচে ২৮ মিনিটের মাথায় লিস্টন কোলাসোর গোলে এগিয়ে যায় মোহনবাগান এসজি। ৮০ মিনিটের মাথায় ব্যবধান বাড়িয়ে নেন অস্ট্রেলীয় ফরোয়ার্ড জেসন কামিংস। সারা ম্যাচে গোলের জন্য মরিয়া মুম্বই সিটি এফসি-কে অবশেষে ৮৯ মিনিটর মাথায় গোল এনে দেন লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে। 

এই ম্যাচে ড্র করলেই লিগশিল্ড উঠত মুম্বইয়ের ফুটবলারদের হাতে। কিন্তু ম্যাচের শেষ ১০ মিনিট দশ জনে খেলেও মুম্বইকে সেই আকাঙ্খিত গোলটি করতে দেয়নি মোহনবাগানের দুর্ভেদ্য রক্ষণ। ২২ ম্যাচে ৪৮ পয়েন্ট অর্জন করে লিগের সেরার খেতাব জিতে নেয় তারা। যা লিগের ইতিহাসে এক নয়া রেকর্ড। 

এই সাফল্যের ফলে আগামী মরশুমে এশিয়ার সেরা ক্লাব প্রতিযোগিতা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের গ্রুপ পর্বে সরাসরি খেলার যোগ্যতাও অর্জন করল কলকাতার দল। যে কৃতিত্ব এর আগে এফসি গোয়া ও মুম্বই সিটি এফসি-ও  অর্জন করেছিল। 

সোমবার যুবভারতীর গ্যালারিতে উপস্থিত প্রায় ৬২ হাজার সমর্থকের সামনে এই অসাধারণ সাফল্য পায় সবুজ-মেরুন বাহিনী। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে সারা গ্যালারি। মাঠেও উচ্ছ্বাস ও উল্লাসের বন্যা বয়ে যায়। 

এই ম্যাচের সেরা ফুটবলারের খেতাব অর্জন করেন যিনি, সেই সবুজ-মেরুন ব্রিগেডের অস্ট্রেলীয় ফরোয়ার্ড দিমিত্রিয়স পেট্রাটস এই সাফল্য নিয়ে indiansuperleague.com কে বলেন, “এই সাফল্য পুরো দলের। এবং এই সাফল্য আমাদের অসাধারণ সমর্থকদের জন্য। আমরা আজ ইতিহাস তৈরি করেছি। সমর্থকদের উল্লাসে একটা সময় মাঠের মধ্যে আমরা একে অপরের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না। আমাদের সমর্থকেরাই আজ আমাদের বাড়তি সুবিধা করে দেয়। কত মানুষ ছিল গ্যালারিতে! প্রায় ৬১ হাজার হবে। অসাধারণ, সত্যিই বিস্ময়কর”। সোমবার দুটি গোলেই অ্যাসিস্ট করেন পেট্রাটস। এই নিয়ে চলতি মরশুমে সাতটি ম্যাচে দলের গোলে অবদান রাখলেন তিনি। আইএসএলে মোহনবাগানের ৩৫টি গোলে অবদান রেখেছেন তিনি। ২২টি নিজে করেছেন ও ১৩টি করিয়েছেন। এই ম্যাচেই তিনি এতদিন থাকা রয় কৃষ্ণার (৩৩) গোল অবদানের রেকর্ড ভেঙে দেন। 

শিল্ড জয়ের লক্ষ্য পূরণ হয়ে গিয়েছে। এ বার যে তাদের লক্ষ্য গতবারের জেতা কাপ নিজেদের কাছে ধরে রাখা, তা স্পষ্ট জানিয়ে পেট্রাটস বলেন, “আজ আমরা পুরোপুরি নিজেদের ওপর ফোকাস করেছিলাম। যার ফলে লক্ষ্য পূরণ হল। এখন আমরা এই শিল্ড জয় উপভোগ করব। এর পরে আমরা মরশুমের তৃতীয় ট্রফি জয়ের জন্য ঝাঁপাব। এই খেতাব আমাদের সমর্থকদের সকলকে ও আমাদের পরিবারের সদস্যদের উৎসর্গ করতে চাই”। 

এই সাফল্যে স্প্যানিশ কোচ আন্তোনিও হাবাসকেও কৃতিত্ব দিতে ভোলেননি অস্ট্রেলীয় তারকা, যিনি এ মরশুমে দশটি গোল করেছেন ও ছ’টি করিয়েছেন। কোচ সম্পর্কে তিনি বলেন, “দলে যোগ দেওয়ার পর কোচ আমাদের সবসময় বলেছেন একটা দল হিসেবে খেলতে। আমরা আজ খেলা শুরুর বাঁশি থেকে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত একদম এককাট্টা ছিলাম, একসঙ্গে লড়েছি। সেই জন্যই জিতলাম”। 

অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে খেলে আসা ফরোয়ার্ড জেসম কামিংসও উচ্ছ্বসিত এই সাফল্যে। সোমবার মোহনবাগানের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি আসে তাঁরই পা থেকে। পেট্রাটসের মতো তাঁরও এ বারের লিগে দশ গোল হয়ে গেল। সেই কামিংস এই সাফল্য নিয়ে বলেন, “দুর্দান্ত লাগছে আমার। এত সমর্থকের সামনে ভারতসেরার খেতাব পাওয়াটা খুবই আনন্দদায়ক। আমাদের সমর্থকেরা অসাধারণ। দলের সবার এটা প্রাপ্য ছিল। সারা মরশুমটাই আমাদের ভাল গিয়েছে। আমরা বরাবর সঙ্ঘবদ্ধ ছিলাম এবং তার পুরষ্কারও পেলাম”।

ডুরান্ড কাপ, আইএসএল শিল্ডের পর যে ত্রিমুকুট জেতাই তাঁদের লক্ষ্য তাও জানিয়ে দিলেন কামিংস। বলেন, “ত্রিমুকুট আমরা জিততেই পারি। সে জন্য আমাদের পরের ম্যাচগুলোতে (সোমিফাইনাল) ফোকাস করতে হবে। ত্রিমুকুট জেতার সুযোগ আমাদের সামনে আছে। আমাদের সামনে এখন প্লে-অফ। সেখানে জেতার পরে আমরা আসল সেলিব্রেশন করব”। 

সোমবার ম্যাচের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার মিনিট দশেক আগে দলের হয়ে দ্বিতীয় গোল করেন কামিংস। সেই গোল নিয়ে তিনি বেশি কিছু না বলে দলের প্রশংসাই করলেন বেশি। বলেন, “আমার গোলটা আমি সতীর্থদের উৎসর্গ করতে চাই। আমাদের দলটা অসাধারণ, যেখানে একজন মহান কোচ ও একদল দুর্দান্ত স্টাফ আছে। সব মিলিয়ে খুব ভাল দল আমাদের। আমাদের এটা প্রাপ্য ছিল। এখন আমরা সেলিব্রেট করব”। 

সমর্থখদের ভূয়ষী প্রশংসা করে কামিংস বলেন, “আজ সমর্থকেরা আমাদের খুব সাহায্য করেছেন। অসাধারণ এক পরিবেশ ছিল স্টেডিয়ামে। সমর্থকদের উৎসাহও ছিল সে রকম। আমাদের সমর্থকেরাই এই লিগে সেরা। মুম্বই সিটি এফসি-কে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা সত্যিই স্পেশ্যাল। এই দিনটা সারা জীবন মনে রাখব”। 

প্রথম গোলের নায়ক লিস্টন কোলাসো, যিনি গত ম্যাচে প্রথম দলে না থাকলেও এই ম্যাচে ছিলেন শুরু থেকেই, তিনি বলেন, “আইএসএল লিগ শিল্ড জেতায় দলের জন্য আমি দারুন খুশি। আমার গোলটা সতীর্থদের প্রতি উৎসর্গ করতে চাই। গত সাত মাস ধরে আমরা শিল্ড জয়ের জন্যই পরিশ্রম করেছি। মনে হয় লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। আমরা সবাই খুব খুশি। এখন আমরা এই মুহূর্তটা উপভোগ করব এবং তার পরে প্লে অফে মন দেব। এই লিগে অনেক ভাল ভাল গোল করেছি। তবে আমার কাছে এটাই সেরা। কারণ, এই গোলের জন্য দল খুব গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে”। চলতি লিগে দলের আটটি গোলে তাঁর অবদান রয়েছে। চারটি নিজে করেছেন এবং চারটি করিয়েছেন কোলাসো। পরিসংখ্যান বলছে, আইএসএলে মোহনবাগানের জার্সিতে যে ১৩টি ম্যাচে গোল করেছেন তিনি, তার প্রতিটিতেই দল জিতেছে। 

এ মরশুমে মোহনবাগানকে আট গোল এনে দেওয়া আলবানিয়ার ফরোয়ার্ড আরমান্দো সাদিকুর মুখেও দলের সমর্থকদের প্রশংসা। তিনি বলেন, “আটমাস ধরে যে কঠোর অনুশীলন করেছি আমরা, এ তারই ফল। আজ আমরাই চ্যাম্পিয়ন। সবার জন্য খুব আনন্দ হচ্ছে। দুঃসময়ে যে সমর্থকেরা আমাদের পাশে ছিলেন, সে জন্য সবাইকে ধন্যবাদ। আশা করি, সবাই খুব আনন্দ করতে করতে বাড়ি ফিরেছেন, কারণ, আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। এই জয় আমাদের আরও উজ্জীবিত করবে। ড্রেসিংরুমে সেই কথাই হচ্ছিল। আমরা তৈরি। আমরা খুব ভাল করে জানি, আমরা কী পারি। তো আর একটা ট্রফি জয়ের জন্য তৈরি হও সবাই”। 

লিগ টেবলে শীর্ষে থাকায় সরাসরি সেমিফাইনালে খেলবে মোহনবাগান এসজি। প্রথম সেমিফাইনালে তাদের ওডিশা এফসি বা কেরালা ব্লাস্টার্সের ঘরের মাঠে খেলতে হবে ২৩ এপ্রিল। ২৮ এপ্রিল সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগ তারা খেলবে যুবভারতীতে। অপর সেমিফাইনালে মুম্বই সিটি এফসি প্রথমে অ্যাওয়ে ম্যাচ খেলবে ২৪ এপ্রিল, এফসি গোয়া অথবা চেন্নাইন এফসি-র বিরুদ্ধে। তাদের সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগ ২৯ এপ্রিল, ঘরের মাঠে। সেমিফাইনালের গণ্ডী পেরতে পারলে ৪ মে ফাইনালে ফের মুখোমুখি হতে পারে মোহনবাগান ও মুম্বই।