গো ফর গোল’— একটা সময় ফিফা বিশ্বকাপের স্লোগানই ছিল এটি। তখন ফুটবলের কৌশল এমন হয়ে উঠেছিল যে, ক্রমশ গোলের সংখ্যা কমে আসছিল ফুটবলবিশ্বে। এই গোলখরা দেখে হতাশ হয়ে উঠেছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা। ফুটবলে গোলের কদর সব সময়ই বেশি। তাই গোলদাতারাও কদর পেয়ে থাকেন বেশি। একটা বড় ম্যাচে একটা গোলই একজন ফুটবলারকে রাতারাতি নায়ক বানিয়ে দিতে পারে। আর একটা টুর্নামেন্টে যে খেলোয়াড় সবচেয়ে বেশি গোল পান, তাকে নিয়ে তো রীতিমতো মাতামাতি শুরু হয়ে যায়। সে জ্ন্যই ফুটবলে ফরোয়ার্ডদের দিকেই তাকিয়ে থাকে সবাই। কখন তারা গোল করবে, আর স্টেডিয়ামে উপস্থিত ফুটবলপ্রেমীরা আনন্দে লাফিয়ে উঠবে, এই মুহূর্তের অপেক্ষাতেই থাকে সবাই। 

সদ্যসমাপ্ত আইএসএলের দশম মরশুমে মোট ৩৮৪ গোল হয়েছে ম্যাচপ্রতি ২.৭৬-এর গড়ে, যা গত মরশুমের তুলনায় কম। ২০২২-২৩-এ ৩৪৫টি গোল হয় ২.৯৫-এর গড়ে। ২০২১-২২-এর গড় ছিল আরও বেশি, ৩.০৮, আইএসএলের ইতিহাসে যা সর্বোচ্চ গড়। তবে গোলের সংখ্যা এবারেই সবচেয়ে বেশি। কারণ, ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে।  

এ বার আইএসএলে সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন দুজন। কেরালা ব্লাস্টার্সের দিমিত্রিয়স দিয়ামান্তাকস ও ওডিশা এফসি-র রয় কৃষ্ণা। অবশ্য সবচেয়ে কম সময় অন্তর একেকটি গোলের সুবাদে সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরষ্কার গোল্ডেন বুট পেয়েছেন দিয়ামান্তাকস। আইএসএলে গোল্ডেন বুটজয়ী তারকাদের অনেকেই অবশ্য এর চেয়ে বেশি গোল করেছেন। ২০১৭-১৮-র গোল্ডেন বুটজয়ী ফেরান কোরোমিনাস ও ২০২১-২২-এ বার্থোলোমিউ ওগবেচে একই মরশুমে ১৮ গোল করেছিলেন। ১৬ গোল করে ২০১৮-১৯-এ সেরার শিরোপা পেয়েছিলেন কোরোমিনাসই। ২০১৯-২০-তে ১৫ গোল করেছিলেন ওগবেচে। 

রয় কৃষ্ণা নিজেই একবার ১৪ গোল ও আর একবার ১৫ গোল করেছিলেন। কিন্তু সোনার বুট জিততে পারেননি। এ বার তিনি ও দিয়ামান্তাকস ছাড়াও একঝাঁক ফরোয়ার্ড মাতিয়েছেন ইন্ডিয়ান সুপার লিগ। গোলের বন্যা বইয়ে দিয়েছেন তাঁরা। সে রকমই কয়েকজন ফরোয়ার্ডের পারফরম্যান্স কেমন ছিল, তা দেখে নেওয়া যাক এই প্রতিবেদনে। 

রয় কৃষ্ণা, ওডিশা এফসি 

গত বছর বেঙ্গালুরু এফসি-র হয়ে খেলার পর এ বার আইএসএলে তিনি জার্সি বদল করে চলে আসেন ওডিশা এফসি-তে। কলিঙ্গ বাহিনীর আক্রমণ বিভাগে অন্যতম সেরা অস্ত্র হয়ে ওঠেন তিনি। গত দুবার বেশি গোল করতে না পারার জ্বালা তিনি এ বার মিটিয়ে নিয়েছেন ১৩ গোল করে। গত দুই মরশুম মিলিয়ে যত গোল করেন রয়, এ মরশুমে তত গোলই করেন তিনি। প্রতি ম্যাচে গড়ে ০.৫২ গোল করেন তিনি। কনভারশন রেট অর্থাৎ শটকে গোলে পরিণত করার হার ছিল ৩৭.১৪%। প্রচুর অভিজ্ঞতা, প্রশংসনীয় পরিশ্রম এবং উন্নত পারফরম্যান্সের ফলে ওডিশার আক্রমণে তিনিই হয়ে ওঠেন সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। ছাপিয়ে যান ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড দিয়েগো মরিসিওকেও। 

মরশুমের শুরুর দিকে তেমন ধারাবাহিক ছিলেন না রয়। দলের দ্বিতীয় ম্যাচে গোলের অ্যকাউন্ট খোলার পর ফের গোল করেন সপ্তম ম্যাচে। ডিসেম্বর থেকে গোলে ফেরেন তিনি। এক মাসে ছটি ম্যাচে পাঁচটি গোল করেন তিনি। একটি ম্যাচে ছিল জোড়া গোল। জানুয়ারির অবকাশের পর মাঠে ফিরে জোড়া গোল দিয়েই নতুন বছর দিয়ে শুরু করেন ফিজিয়ান তারকা। এর পর থেকে ওডিশা এফসি-র বেশিরভাগ ম্যাচে তাঁকে গোল করতে দেখা গিয়েছে। সেমিফাইনালের প্রথম লেগে প্রাক্তন ক্লাব মোহনবাগান এসজি-র বিরুদ্ধে জয়সূচক গোলটিও তিনিই করেন। ১৩টি গোল করার পাশাপাশি তিনটি অ্যাসিস্টও করেন রয় কৃষ্ণা। 

দিমিত্রিয়স দিয়ামান্তাকস, কেরালা ব্লাস্টার্স 

চোট ও সাসপেনশনের জন্য এ মরশুমে একাধিক নির্ভরযোগ্য ফুটবলারকে কেরালা ব্লাস্টার্স ধারাবাহিক ভাবে না পেলেও এই গ্রিক ফরোয়ার্ড কিন্তু ধারাবাহিক ভাবে ভাল খেলে গিয়েছেন সারা মরশুম ধরেই। মূলত তাঁর জন্যই ইভান ভুকোমানোভিচের দল টানা তৃতীয়বার প্লে অফে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। ১৭টি ম্যাচে ১৩টি গোল করেন দিয়ামান্তাকস। সারা মরশুমে প্রতিপক্ষের রক্ষণের কাছে রীতিমতো ত্রাস হয়ে ওঠেন তিনি। সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় নিজেকে নিয়ে যাওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা এবং হাফ চান্সকে গোলে পরিণত করার দক্ষতাই তাঁকে বিপজ্জনক করে তোলে। দুর্দান্ত ফিনিশিং-এর ক্ষমতাসম্পন্ন এই ফরোয়ার্ডের গোল কনভারশন রেট ৪০.৬২% 

শুরুর চারটি ম্যাচে তিনি গোল না পেলেও তার পর থেকে বেশির ভাগ ম্যাচেই গোল করেন তিনি। চেন্নাইন এফসি, এফসি গোয়া ও মোহনবাগান এসজি-র বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেন তিনি। মোহনবাগানের বিরুদ্ধে স্টপেজ টাইমের শেষ মিনিটে তাঁর গোলের কথা নিশ্চয়ই অনেকেরই মনে আছে। কিন্তু চোটের জন্য নক আউটের ম্যাচে খেলতে পারেননি তিনি। 

দিমিত্রিয়স পেট্রাটস, মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট 

অস্ট্রেলীয় তারকা যে শুধু গোল করেছেন, তা নয়, প্রচুর গোল করতে সাহায্যও করেছেন। সব মিলিয়ে দলের ১৭টি গোলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান রেখেছেন তিনি। যার ফলে এ বারের লিগের সেরা ফুটবলারের খেতাবটিই জিতে নেন দিমিত্রিয়স পেট্রাটস। নিজে দশ গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের সাতটি গোল করতে সাহায্য করেন তিনি। ১৮৯৬ মিনিট মাঠে থেকে প্রতিপক্ষের বক্সে ৬৮বার বলে পা ছোঁয়ান তিনি। ৬০টি গোলের সুযোগ তৈরি করেন এবং ৫৩টি গোলমুখী পাস বাড়ান। গোলের লক্ষ্যে তাঁর শটের সংখ্যা ছিল ৩০। 

আক্রমণ বিভাগে এমন পরিসংখ্যান যে ফুটবলারের, তাঁকে পেতে চাইবেন যে কোনও কোচই। মাঠে তাঁর সৃষ্টিশীল ফুটবল, গতি ও ক্ষিপ্রতা তাঁকে সবুজ-মেরুন শিবিরের সবচেয়ে কার্যকরী ফুটবলার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে তোলে। দলের প্রথম লিগশিল্ড জয়ে তিনি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সবুজ-মেরুন বাহিনীর নিউক্লিয়াস ছিলেন তিনি। ফাইনালে দলের হেরে যাওয়ার নেপথ্যে তাঁর ছন্দে না থাকাকেও দায়ী করেছেন অনেকে।         

লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে, মুম্বই সিটি এফসি 

দেশের অন্যতম সেরা উইঙ্গার বলা হয় তাঁকে। নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে তা প্রমাণও করেছেন মিজোরামের এই তারকা ফুটবলার। গত মরশুমের মতো এ মরশুমেও দশটি গোল করেছেন আইএসএলে, যা আজ পর্যন্ত কোনও ভারতীয় ফুটবলার করতে পারেননি। বিভিন্ন ক্লাবের আক্রমণ বিভাগে ভারতীয় ফুটবলারদের অভাবের জন্যই ভারতীয় দলে গোল করার লোকের অভাব হচ্ছে, যাঁরা এই কথা বলছেন, তাঁদের কিছুটা হলেও স্বস্তি দিতে পারেন মুম্বইয়ের উইঙ্গার জুটি লালিয়ানজুয়ালা ছাঙতে ও বিক্রমপ্রতাপ সিং। ছাঙতে যে শুধু দশটি গোল করেছেন, তা নয়। ছ’টি গোলে অ্যাসিস্টও করেছেন। 

মুম্বই শিবিরে তাঁর গোল-অবদানই সবচেয়ে বেশি। এই ব্যাপারে দলের বিদেশী ফুটবলারদেরও পিছনে ফেলে দিয়েছেন তিনি। এর চেয়ে গর্বের বিষয় আর কীই বা হতে পারে? প্রতিপক্ষের গোলের সামনে তাঁর সক্রিয়তা, নিখুঁত পারফরম্যান্স, সুযোগসন্ধানী মানসিকতা ও ফিনিশিংয়ের দক্ষতাই ছাঙতেকে অন্যতম সেরাদের তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে। প্রতিপক্ষের বক্সে ১২৬বার বল ছুঁয়েছেন তিনি। ৩৭টি সফল ড্রিবল করেছেন। ৪৩টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। তাঁর গোল কনভারশেন রেটও বেশ ভাল, ২২.৭৩%। 

জেসন কামিংস, মোহনবাগান এসজি 

ফিফা বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে ইন্ডিয়ান সুপার লিগে খেলতে আসা ফুটবলার তিনিই প্রথম। তাই তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাশাও ছিল বেশি। কিন্তু ২০২২ বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে খেলে আসা জেসন কামিংস ততটা প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারলেও দলকে অনেকগুলি গোল এনে দিয়েছেন। এ লিগের চ্যাম্পিয়ন দল থেকে মোহনবাগানে আসা কামিংস দলের লিগশিল্ড জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এ মরশুমে মোহনবাগানের আক্রমণ বিভাগে তাঁকে ও আলবানিয়ার ইউরো কাপার আরমান্দো সাদিকুকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে খেলান তাদের কোচেরা। কামিংস যখনই সুযোগ পেয়েছেন, তখনই তা কাজে লাগিয়ে নিয়েছেন। তবে আক্রমণে যে ভূমিকা নিয়েছেন পেট্রাটস, অতটা বেশি দায়িত্ব নিতে পারেননি তিনি। তবে তাঁকে গোল সাজিয়ে দেওয়া হলে তিনি তার সদ্ব্যবহার করেছেন বারবার। 

তাঁর ও পেট্রাটসের জুটি প্রতিপক্ষের কাছে রীতিমতো চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে। ২৩টি ম্যাচে মাঠে নেমে ১২টি গোল ও দু’টি অ্যাসিস্ট করেন তিনি। দলের সাফল্যে তাঁর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। দলের প্রথম ম্যাচে প্রথম গোলটিই করেন কামিংস। কিন্তু লিগের দ্বিতীয় গোল পেতে তাঁকে আরও পাঁচটি ম্যাচ অপেক্ষা করতে হয়। নর্থইস্টের বিরুদ্ধে গোল করার পরে নিয়মিত গোল পেতে শুরু করেন তিনি। মুম্বই সিটি এফসি, হায়দরাবাদ এফসি, নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি, জামশেদপুর এফসি, ইস্টবেঙ্গল এফসি, কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে গোল করেন তিনি। মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে লিগশিল্ড জয়ের ম্যাচে প্রথম গোল করেন কামিংসই। ওডিশার বিরুদ্ধে সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগেও প্রথম গোল আসে তাঁর পা থেকেই।

বিক্রম প্রতাপ সিং, মুম্বই সিটি এফসি 

কাপজয়ী মুম্বই সিটি এফসি-র উইঙ্গার বিক্রম প্রতাপের দক্ষতা, গতি ও ক্ষিপ্রতা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন তাঁদের বিদেশী কোচ পিটার ক্রাতকিও। দুই উইং দিয়ে তাঁর ও ছাঙতের নাগাড়ে গতিময় আক্রমণ বেশিরভাগ প্রতিপক্ষই সামলাতে পারেনি। বিপক্ষের গোলের সামনে ছাঙতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছেন বিক্রমপ্রতাপ। গত তিন মরশুমে পাঁচ গোল পাওয়া বিক্রম এ বার একই মরশুমে আট গোল করে সকলের নজর কেড়ে নেন। একজন ভারতীয় ফরোয়ার্ডের খেলায় এমন অভাবনীয় উন্নতি অনেকেই আশা করেননি। ছাঙতেকে পাশে পেয়ে তিনি যেন আরও আগ্রাসী হয়ে উঠেছেন। যার ফলে এ বারের লিগের সেরা উঠতি খেলোয়াড়ের পুরষ্কারটি জিতে নেন পাঞ্জাব থেকে উঠে আসা বিক্রম। নর্থইস্ট ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করেন এই তরুণ ফুটবলার। এ ছাড়াও চেন্নাইন এফসি, বেঙ্গালুরু এফসি (২), এফসি গোয়ার বিরুদ্ধেও গোল করেন তিনি।