আর কয়েক ঘণ্টা পরেই ভারতীয় ফুটবলের কিংবদন্তি সুনীল ছেত্রীকে বিদায় জানাবেন ভারতীয় ফুটবলপ্রেমীরা। যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ভারত বনাম কুয়েত ম্যাচই হতে চলেছে দেশের জার্সি গায়ে শেষ ম্যাচ সুনীলের। 

১৯ বছরের আন্তর্জাতিক ফুটবল কেরিয়ারে ভারতীয় ফুটবলের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে ছিলেন সুনীল। বৃহস্পতিবারের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও গোলের জন্য সবচেয়ে বেশি দর্শক তাঁর দিকেই হয়তো তাকিয়ে থাকবেন। কারণ, সুনীল ছেত্রীর গোল করার দক্ষতা অন্যান্য যে কোনও ভারতীয় স্ট্রাইকারের চেয়ে ভাল। সুযোগসন্ধানী সুনীল তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবল কেরিয়ারে বহু অভাবনীয়, অবিশ্বাস্য গোল করেছেন এবং ভারতীয় ফুটবলকে গর্বিত করেছেন। 

৩৯ বছর বয়সী সুনীল বিশ্বের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় বর্তমান ফুটবলারদের মধ্যে লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পরেই রয়েছেন, যা আর কোনও ভারতীয় ফুটবলারেরই নেই। তাঁর ফুটবল কেরিয়ারের অতীতে ফিরে গেলে যে সেরা পাঁচটি বছরকে তুলে আনা যায়, সেগুলি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এই বিশেষ প্রতিবেদনে। ফিরে দেখা যাক সুনীল ছেত্রীর সেরা পাঁচটি বছর। 

২০১১: সেরা বছর 

গোলসংখ্যা: ১৩

আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই বছরটি অসাধারণ কাটান সুনীল। এই বছরেই নিজেকে ভারতীয় দলের সেরা স্ট্রাইকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি। গোলসংখ্যার দিক থেকে সেটিই ছিল সুনীলের সেরা বছর। ভারতীয় দলের হয়ে মোট ১৩টি গোল করেছিলেন তিনি। সে বছর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁর করা গোলগুলিই দলের সাফল্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই টুর্নামেন্টে তিনি সাত গোল করেন। এএফসি এশিয়ান কাপেও দক্ষিণ কোরিয়া ও বাহরিনের বিরুদ্ধে গোল করেন তিনি। 

২০১৮: মাইলফল প্রতিষ্ঠার বছর

গোলসংখ্যা: ৮

সেই বছরে তাঁর আন্তর্জাতিক ফুটবল জীবনে সেরা মাইলস্টোনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সুনীল। যদিও একাধিক নজির গড়েন তিনি ২০১৮-য়। কিন্তু সেরাটি ছিল ভারতের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করা ও সারা দুনিয়ার বর্তমান সর্বোচ্চ আন্তর্জাতিক গোলদাতাদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে নিজেকে নিয়ে যাওয়া, অন্যতম বিশ্বসেরা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পরেই। ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে সুনীলের হ্যাটট্রিকে চিনা তাইপেকে হারায় ভারত। সেই টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়নও হয় ভারত। সেই টুর্নামেন্টের প্রতি ম্যাচেই গোল করেন সুনীল। বাকি তিনটি ম্যাচে পাঁচ গোল করেন তিনি। তবে সেবার সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে পারেননি তিনি।     

২০১৯: ধারাবাহিক পারফরম্যান্স

গোলসংখ্যা: ৭ 

২০১৮-য় ভারতের মাঠে নেমে যে ফর্মে ছিলেন সুনীল, পরের বছর সেই ফর্মই ধরে রাখেন তিনি। বরং আগের বছরের চেয়ে সে বছর বেশি টুর্নামেন্টেও খেলেন তিনি। যে গোলগুলি কপরেছিলেন সুনীল, তার সবকটিই ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রতিটি গোলই ভারতকে সাফল্য এনে দেয়। এর ফলে তিনিই ভারতীয় দলের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ফুটবলার হয়ে ওঠেন। এএফসি এশিয়ান কাপে থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর দুটি গোলই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সে ম্যাচে ৪-১-এ জেতে ভারত। ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে তাজিকিস্তানের বিরুদ্ধে দু’গোল ও উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে এক গোল করেন তিনি। 

২০২১: দৃষ্টান্ত স্থাপন 

গোলসংখ্যা: ৮

এ বছর ভারতীয় দলকে ধারাবাহিক ভাবে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন সুনীল। অধিনায়ক হিসেবে তো বটেই, স্ট্রাইকার হিসেবেও। পরিণত দক্ষতা ও ১৬ বছরের অভিজ্ঞতার মিশেলে, তিনি হয়ে ওঠেন সত্যিকারের ক্যাপ্টেন। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে যথারীতি তিনিই ছিলেন সেরা। সেবারের টুর্নামেন্টে পাঁচটি গোল করেন তিনি। মলদ্বীপের বিরুদ্ধে ছিল জোড়া গোল। এ ছাড়া বাংলাদেশ ও নেপালের বিরুদ্ধে দুটি ম্যাচে গোল পান তিনি। বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জোড়া গোল করেন সুনীল। 

২০২৩: বয়স যখন সংখ্যামাত্র 

গোলসংখ্যা: ৯

এই সময়েই তাঁর অবসর নিয়ে জল্পনা চরমে ওঠে। আর কতদিন মাঠে থাকবেন, কতদিন ভারতের জার্সি পরে মাঠে নামবেন, গোলের সেঞ্চুরি হবে কি না, তাঁর উত্তরসূরী কারা হতে পারেন, এ সব নিয়ে জল্পনা ওঠে তুঙ্গে। কারণ, তখন তাঁর বয়স ৩৮। কিন্তু বয়স যে একটা সংখ্যামাত্র, ইচ্ছেশক্তি ও ফিটনেসই যে একজন খেলোয়াড়কে দীর্ঘজীবী করে তোলে, তা প্রমাণ করে দেন সুনীল। এ বছরও ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোলগুলি করেন তিনিই। সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। যে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গোল করে আন্তর্জাতিক কেরিয়ার শুরু করেছিলেন সুনীল, তাদের বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক করে একটি বৃত্ত সম্পুর্ণ করেন তিনি। এ ছাড়া নেপাল ও কুয়েতের বিরুদ্ধেও গোল করেন তিনি। কিরগিজস্তান ও মালয়েশিয়ার বিরুদ্ধে ফ্রেন্ডলি ম্যাচেও গোল করেন তিনি। এ ছাড়া ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপেও দুটি গোল করেন সুনীল।

বিদায়ী ম্যাচের আগে যা বললেন সুনীল 

অবসর প্রসঙ্গে 

আমাকে দয়া করে জিজ্ঞেস করবেন না, কেমন লাগছে। কারণ, সেটা আমি বলতে পারব না। এই ম্যাচে আমাদের জিততেই হবে। ম্যাচটা জিততে পারলে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের তৃতীয় রাউন্ডের দোরগোড়ায় চলে যাব আমরা, যেখানে আমরা কখনও পৌঁছতে পারিনি। তবে এটা সহজ হবে না। তবে আমরা খুশি যে, ম্যাচটা কলকাতায় খেলতে পারছি। দুর্দান্ত সমর্থন পাব। 

অবসরের পরে 

সুন্দর একটা সুট পরে ভারতের খেলা দেখতে যাব। আশা করি, আমরা তৃতীয় রাউন্ডে উঠব। সেখানে এশিয়ার সেরা দলগুলির বিরুদ্ধে দশটা দুর্দান্ত ম্যাচ খেলব। আশা করি, সেই ম্যাচগুলো দেখার জন্য বিনামূল্যে টিকিট পাব। কিন্তু এগুলো পেতে গেলে এই ম্যাচে আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে। ছেলেদের প্রতিদিন এটাই বলি। শুধু একবার কল্পনা করুন, আমরা তৃতীয় রাউন্ডে জাপান বা অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে খেলছি। সেই জন্যই এই জয়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমার ১৯ বছরের কেরিয়ারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এটা। এমন একটা ঐতিহাসিক ম্যাচ খেলে বিদায় নেওয়ার চেয়ে ভাল আর কী হতে পারে?