ছন্দে ফেরা বেঙ্গালুরুকে হারিয়ে সেরা চারে ফেরার চ্যালেঞ্জ এটিকে মোহনবাগানের

গত কয়েক দিনে হিরো আইএসএলের লিগ টেবলে যে ভাবে প্রতিদিন এক নম্বর দলের নাম বদলে যাচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে, এই সময়ে মাঠে সক্রিয় না থাকলে ও সাফল্য না পেলে সেরা চারের মধ্যে থাকা অসম্ভব। এটিকে মোহনবাগানের ক্ষেত্রে ঠিক এটাই হয়েছে।

হায়দরাবাদ এফসি-র সঙ্গে পয়েন্ট ভাগাভাগির পরে লিগ টেবলে এক নম্বরে চলে যায় হায়দরাবাদ এফসি। মুম্বই সিটি এফসি ও তাদের সংগ্রহ তখন ১৬ পয়েন্ট করে। ১৫ পয়েন্ট নিয়ে এটিকে মোহনবাগান কেরালা ব্লাস্টার্সকে সরিয়ে চার থেকে উঠে আসে তিন নম্বরে। কেরালা ব্লাস্টার্স ১৪ পয়েন্ট নিয়ে তখন তিন থেকে নেমে গিয়েছিল চারে। কিন্তু দশ দিন পরে ছবিটা একেবারে অন্যরকম।

কেরালা ব্লাস্টার্স এখন এক নম্বরে। হায়দরাবাদ তিনে ও মুম্বই চারে। জামশেদপুর এফসি এই ক’দিনে সেরা চারে ঢুকে কেরালার পরের জায়গাটাই নিয়ে নিয়েছে। আর যাদের কথা হচ্ছিল, সেই এটিকে মোহনবাগান সেরা চার থেকে ছিটকে বেরিয়ে নেমে এসেছে পাঁচে।

এই পাঁচ থেকে ফের সেরা চারে ঢুকতে গেলে শনিবার পন্ডিত জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে বেঙ্গালুরু এফসি-কে হারাতে হবে তাদের। জিতলে শুধু যে সেরা চারে ফিরবে তারা, তা-ই নয়, জায়গা করে নেবে দুই নম্বরে, কেরালার দলের পরেই। তবে যে দলের বিরুদ্ধে শনিবার খেলতে নামবে কলকাতার দল, সেই বেঙ্গালুরু এফসি-র পারফরম্যান্সের গ্রাফ যে ভাবে এগোচ্ছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে, তাদের হারানো মোটেই সোজা নয়।

গত ১১ ডিসেম্বরের পরে আর কোনও দল হারাতে পারেনি বেঙ্গালুরু এফসি-কে। ওই তারিখের পরে যে পাঁচটি ম্যাচ তারা খেলেছে, তার মধ্যে তিনটি ম্যাচে তারা ড্র করেছে এবং দু’টিতে জিতেছে। এই পাঁচ ম্যাচে ১১টি গোল করেছে তারা, খেয়েছে ছ’টি। চেন্নাইন এফসি-কে ৪-২-এ ও মুম্বই সিটি এফসি-কে ৩-০-য় হারিয়েছে তারা। এই পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে এটিকে মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ৩-৩ ড্র-ও ছিল তাদের। জামশেদপুর এফসি ও এসসি ইস্টবেঙ্গলের বিরুদ্ধেও ম্যাচ অমীমাংসিত রেখে মাঠ ছাড়ে তারা। এমন দলকে হারানো বোধহয় খিব একটা সহজ হবে না সবুজ-মেরুন বাহিনীর পক্ষে।

প্রতিপক্ষ যখন চোট-আঘাতও

এই ম্যাচে হুগো বুমৌস এবং কার্ল ম্যাকহিউ যখন নেই, তখন গোল করা ও গোল বাঁচানো দুটোই বেশ কঠিন হয়ে উঠতে পারে এটিকে মোহনবাগানের পক্ষে।

এফসি গোয়া ছেড়ে এটিকে মোহনবাগানের দায়িত্ব নেওয়ার পরে স্প্যানিশ কোচ হুয়ান ফেরান্দো এখন পর্যন্ত একটিও ম্যাচে হারের মুখোমুখি হননি ঠিকই তবে দলের মধ্যে সমস্যা অনেক বেড়েছে। গোল আসছে ঠিকই, কিন্তু পাশাপাশি গোল খেয়েও চলেছে তারা। দলের রক্ষণের দুর্বলতা ক্রমশ চিন্তা বাড়িয়ে চলেছে ফেরান্দোর। যদিও মুখে বলছেন, এত গোল খাওয়াটা তাঁর কাছে চিন্তার বিষয় নয়, কিন্তু গোল পার্থক্যের হিসাবের সময় এলে যে তাঁর দল অন্যদের তুলনায় পিছিয়ে যেতে পারে সেটা নিশ্চয়ই মাথায় আছে তাঁর। বেঙ্গালুরুর উজ্জীবিত আক্রমণ বিভাগকে আক্রমণ বিভাগকে সামলাতে রক্ষণে তাদের উন্নতি করা ছাড়া উপায় নেই।

৯ ম্যাচে ১৮টি গোল খেয়েছে এটিকে মোহনবাগান। গত বার যেখানে সারা লিগে ১৫ গোল খেয়েছিল তারা, সেখানে এই পরিসংখ্যান চিন্তা বাড়ানোর মতোই। মাত্র একটা ম্যাচে ক্লিন শিট রাখতে পেরেছেন গোলকিপার অমরিন্দর সিং। গতবারের চ্যাম্পিয়ন মুম্বই সিটি এফসি-র জার্সি গায়ে যে ফর্মে ছিলেন তিনি, এই মরশুমে সেই ফর্মে আর দেখা যাচ্ছে না তাঁকে। তাঁর যে একটা চোট আছে এবং সেই কারণেই ছন্দে নেই অমরিন্দর, তা স্বীকার করেও নিয়েছেন ফেরান্দো। দ্বিতীয় গোলকিপার অভিলাষ পালেরও চোট বলে জানা গিয়েছে। তার ওপর কোভিড হানায় বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় অসুস্থ। অর্থাৎ, ভাল রকম বিপদের মধ্যে রয়েছে এটিকে মোহনবাগান।   

গত ম্যাচে কার্ল ম্যাকহিউ বিপক্ষের এক খেলোয়াড়ের সঙ্গে প্রবল সঙ্ঘর্ষে মাঠে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে অ্যাম্বুল্যান্সে চাপিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। তাঁর সেরে উঠতে সময় লাগবে। হুগো বুমৌসের মাথা কিছুতেই ঠাণ্ডা হচ্ছে না। পরপর চারটি হলুদ কার্ড দেখে তিনি শনিবারের ম্যাচে নেই। মাঝমাঠ থেকে যে গোল তৈরির প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকেন এই ফরাসি মিডফিল্ডার, শনিবার বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে আর তা পারবেন না। পাঁচটি গোল করেছেন ও তিনটি করিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ দলের কুড়িটি গোলের চল্লিশ শতাংশেই তাঁর অবদান রয়েছে। এমন একজন খেলোয়াড়কে ছাড়া মাঠে নামা মানেই একটু পিছিয়ে থেকে শুরু করা।

রয় কৃষ্ণা, লিস্টন কোলাসোরা গোলের মধ্যে থাকলেও মনবীর সিং সম্প্রতি গোলের সামনে গিয়ে বারবার দিশাহারা হয়ে যাচ্ছেন। এটা দলের পক্ষে মোটেই ভাল খবর নয়। অবশ্য গত ম্যাচে ডেভিড উইলিয়ামস যে ফর্মে ছিলেন, তাতে সমর্থকদের খুশি হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তাঁর ১২ সেকেন্ডের গোল হিরো আইএসএলে ইতিহাস সৃষ্টি করার পরে তাঁর ওপর প্রত্যাশা বেড়ে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। গত ম্যাচে হুগো বুমৌস ছিলেন। তাই রয় কৃষ্ণাকে প্রথম দলে না রেখে ডেভিডকে শুরু থেকে নামিয়ে বাজিমাত করেন ফেরান্দো। এই ম্যাচে যদি রয় কৃষ্ণা খেলতে পারেন, তা হলে ডেভিড উইলিয়ামসের সঙ্গে তাঁর পুরনো জুটিকে ফিরে পাওয়া যেতে পারে শনিবার। 

ছন্দে ফিরছে বেঙ্গালুরু

গত পাঁচ ম্যাচে অপরাজিত থেকে এমনিতেই আত্মবিশ্বাসের স্তর বেড়েছে বেঙ্গালুরু এফসি-র ফুটবলারদের। তার ওপর গত ম্যাচে তারা যে ভাবে মুম্বই সিটি এফসি-কে তিন গোলে হারিয়েছে, তাতে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পুরনো ও চেনা ছন্দে ফিরে এসেছে সুনীল ছেত্রীর দল। যদিও মুম্বই সিটি এফসি-র সময়টা মোটেই ভাল যাচ্ছে  না। টানা চার ম্যাচে জয়হীন তারা। সেই ম্যাচে প্রিন্স ইবারার জোড়া গোল ও দানিশ ফারুখের গোলে জেতে জার্মান কোচ মার্কো পেজাউওলির দল।

গত দু’টি ম্যাচে ক্লেটন সিলভার কাছ থেকে গোল করার দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নিয়ে প্রিন্স ইবারা সফল হয়ে চলেছেন। দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করেছেন এই দু’জনই। এই দু’জনকে রোখাই হবে এটিকে মোহনবাগান রক্ষণের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কঙ্গোর স্ট্রাইকার ইবারা এই মরশুমে চারটি গোল করেছেন, যার মধ্যে তিনটিতে অ্যাসিস্ট করেছেন রোশন সিং নাওরেম। তিনিও চলতি লিগে বেশ ভাল ফর্মে রয়েছেন। দল ছন্দে ফেরা শুরু করলেও সুনীল ছেত্রী এখনও নিজের আসল চেহারায় ফেরেননি। এখনও একটাও গোল করেননি বা করানওনি। তিনি ফর্মে ফিরলে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বেঙ্গালুরু। ১১ ম্যাচে ১৩ পয়েন্ট পেয়ে তারা আপাতত সাত নম্বরে। শনিবার জিতলে তারা এটিকে মোহনবাগানকে সরিয়ে পাঁচ নম্বরে উঠে আসবে। এটাই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে বড় মোটিভেশন। 

নজরে কারা?

গত মরশুমে এই হায়দরাবাদ এফসি থেকেই রেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে নিজেদের শিবিরে নিয়ে আসা লিস্টন কোলাসো-র ওপর অনেকটাই ভরসা করে রয়েছে সবুজ-মেরুন শিবির। কোলাসো এখন ফুটবল জীবনের সেরা ফর্মে। গত ম্যাচে সে ভাবে খাপ খুলতে না পারলেও এই ম্যাচে তিনি কেমন খেলেন, সেটা অবশ্যই অন্যতম আকর্ষণ। পাঁচটি গোল করে সর্বোচ্চ স্কোরারদের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছেন কোলাসো। ডিসেম্বরের সেরা উঠতি তারকার খেতাবও জিতে নিয়েছেন। ডেভিড উইলিয়ামস গত ম্যাচে শুরু থেকে নেমে সকলের নজর কেড়ে নেন। লিগের শুরু থেকে তিনি পরিবর্ত হিসেবে নামছিলেন। কিন্তু গত ম্যাচেই প্রথম দলে থাকার সুযোগ পান তিনি। এবং ১২ সেকেন্ডের মাথাতেই দুর্দান্ত গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। শুধু গোল করা নয়, সারা ম্যাচে হায়দরাবাদের শক্তিশালী ডিফেন্স তাঁকে সামলাতে হিমশিম খেয়ে গিয়েছে।

সুনীল ছেত্রী ফর্মে না থাকলেও তাঁর অভাব পূরণ করছেন ৩৪ বছর বয়সি ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ড ক্লেটন সিলভা। যিনি এর মধ্যে এগারোটি ম্যাচে পাঁচটি গোল করে ফেলেছেন ও তিনটি করিয়েছেন। এখন তাই সিলভাকে আটকে রাখাটা বিপক্ষের অন্যতম প্রধান কাজ। কিন্তু প্রিন্স ইবারা-ও কম যান না। ক্লেটনের সঙ্গে গোল করার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন কঙ্গোর এই ফরোয়ার্ড। বিপক্ষ যখন ক্লেটনকে কড়া মার্কিংয়ে রেখে আটকে দেয়, তখন অন্য দিক থেকে ইবারাই দলকে গোল এনে দেওয়ার কাজটা শুরু করে দিয়েছেন। ইবারা এই মরশুমে দশ ম্যাচে চারটি গোল করেছেন, যার মধ্যে তিনটিতেই তাঁকে অ্যাসিস্ট করেছেন রোশন সিং নাওরেম। তিনিও বেশ ভাল ফর্মে রয়েছেন। তাই তাঁকেও নজরে রাখতে হবে।

এটিকে মোহনবাগান স্কোয়াড

গোলকিপার: অমরিন্দর সিং, অভিলাষ পাল, অর্শ আনোয়ার শেখ;

ডিফেন্ডার: তিরি, আশুতোষ মেহতা, সুমিত রাঠি, শুভাশিস বোস, প্রীতম কোটাল, প্রবীর দাস, মাইকেল সুসাইরাজ, দীপক টাঙরি, গুরসিমরত গিল, জোস আরোয়ো, রবি রাণা, রিকি সাবং;

মিডফিল্ডার: জনি কাউকো, কার্ল ম্যাকহিউ, হুগো বুমৌস, বিদ্যানন্দ সিং, শেখ সাহিল, অভিষেক সূর্যবংশী, লেনি রড্রিগেজ, ইঙ্গসন সিং;

ফরোয়ার্ড: রয় কৃষ্ণা, ডেভিড উইলিয়ামস, লিস্টন কোলাসো, মনবীর সিং, কিয়ান নাসিরি।

ম্যাচ: এটিকে মোহনবাগান বনাম বেঙ্গালুরু এফসি

তারিখ ও সময়: ১৫ জানুয়ারি, সন্ধ্যা ৭.৩০

ভেনু: পিজেএন স্টেডিয়াম, ফতোরদা

সম্প্রচার: স্টার স্পোর্টস ২, স্টার স্পোর্টস ২ এইচডি, স্টার স্পোর্টস ৩, স্টার স্পোর্টস ১ হিন্দি, স্টার স্পোর্টস ১ হিন্দি এইচডি, স্টার স্পোর্টস ১ বাংলা

অনলাইন স্ট্রিমিং: ডিজনি+হটস্টার ও জিও টিভি

Your Comments

Your Comments