রয় কৃষ্ণার একমাত্র গোলে জয় দিয়ে হিরো আইএসএল ২০২০-২১ শুরু এটিকে মোহনবাগানের

জয় দিয়েই তাদের হিরো আইএসল অভিযান শুরু করল এটিকে মোহনবাগান। নায়ক সেই রয় কৃষ্ণা, যিনি গত মরশুমে মাঠ মাতিয়ে দিয়েছিলেন এবং কলকাতায় চ্যাম্পিয়নের ট্রফি আনার নেপথ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ফিজির সেই অলিম্পিয়ান ঐতিহ্যবাহী সবুজ-মেরুন জার্সি গায়েও মাতিয়ে দিলেন শুক্রবার। ৬৭ মিনিটের মাথায় ম্যাচের একমাত্র গোল করে এ দিন তিনি এটিকে মোহনবাগানের হিরো আইএসএল অভিষেক স্মরণীয় করে রাখলেন।

  • ৪ মিনিট: বাঁ দিক থেকে কর্নারে উড়ে আসা বল পোস্টে লেগে আসে রয় কৃষ্ণার সামনে। প্রায় আনমার্কড রয় গোলের বাইরে শট মারেন।
  • ১২ মিনিট: বিপক্ষের এক ডিফেন্ডারের দেওয়া মারাত্মক বাধায় মাঠে লুটিয়ে পড়েন মাইকেল সুসাইরাজ। তাঁর পরিবর্ত হিসেবে শুভাশিস বসুকে নামান হাবাস। চোট হয়তো গুরুতর।
  • ৩৪ মিনিট: মাঝমাঠে প্রণয়ের পাস থেকে বল নিয়ে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে অনবদ্য একটি দূরপাল্লার শট নেন রয়, যা বারের ওপর দিয়ে চলে যায়।
  • ৩৭ মিনিট: বিপক্ষের গোলের সামনে সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেননি কেরলের দলের ফরোয়ার্ড বাংলার ঋত্বিক দাস।
  • ৫০ মিনিট: গোলের সামনে থেকে অভাবনীয় গোল মিস করলেন সাহাল আব্দুল সামাদ
  • ৬৭ মিনিট: বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে আসা মনবীরের ব্যাক পাস থেকে বাঁ পায়ে দুর্দান্ত গোল করেন রয় কৃষ্ণা।

এ দিন এটিকে মোহনবাগান ৩-৫-২ ফরমেশনে খেলা শুরু করে প্রীতম, তিরি ও ঝিঙ্গনকে রক্ষণে রেখে এবং প্রবীর দাসকে আরও চার মিডফিল্ডারের সঙ্গে মাঝমাঠে রেখে। মাঝমাঠের এই চারজন প্রণয়, ম্যাকহিউ, হার্নান্ডেজ ও সুসাইরাজ। ডেভিড উইলিয়ামসকে বেঞ্চে রেখে এ দিন রয়ের সঙ্গে এডু গার্সিয়াকে আক্রমণে নামান কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস। 

চতুর্থ মিনিটেই এক গোলে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিলেন রয় কৃষ্ণা। বাঁ দিক থেকে কর্নারে উড়ে আসা বল পোস্টে লেগে আসে রয় কৃষ্ণার সামনে। তখন প্রায় ‘আনমার্কড’ ছিলেন তিনি। কিন্তু গোলের বাইরে শট মারেন। আট মাস পরে যে ম্যাচে নেমেছেন, তা রয়ের এই মিস দেখেই বোঝা যায়।

মাঝমাঠকে বাড়তি খেলোয়াড় দিয়ে সাজালেও ১২ মিনিটের মাথায় হাবাসের পরিকল্পনায় বাধা পড়ে মাইকেল সুসাইরাজের চোটের জন্য। বিপক্ষের ডিফেন্ডার তাঁকে মারাত্মক ভাবে বাধা দিলে মাাঠে লুটিয়ে পড়েন সুসাইরাজ। মিনিট দুয়েক চিকিৎসার পরে তাঁকে মাঠের বাইরে নিয়ে এসে পরিবর্ত হিসেবে শুভাশিস বসুকে নামান হাবাস। তাঁকে যন্ত্রণায় ছটফট করতে দেখে মনে হল, হাঁটুতে গুরুতর চোট লেগেছে সুসাইরাজের।

সাইড ব্যাক শুভাশিস মাঠে নামার সঙ্গে সঙ্গে এটিকে মোহনবাগান তাদের ছক বদলে চলে যায় ৪-৩-৩-এ। ওই সময়ে জয়েশ রানেকে নামালে হয়তো মাঝমাঠে লোক বাড়িয়েই রাখতে পারত এটিকে মোহনবাগান। ম্যাচের প্রথম ৪৫ মিনিট এটিকে মোহনবাগানকে ঘনঘন আক্রমণে উঠতে দেখা গেলেও তাদের বিপক্ষ কিন্তু রক্ষণেই বেশি জোর দেয়। শুরু থেকে ৪-৩-৩ ছকে খেলা কেরালা ব্লাস্টার্সের রক্ষণে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলা দুই বিদেশি অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার বার্কিনা ফাসোর বাকারি কোনে ও জিম্বাবোয়ের কোস্তা নামোয়নেসু থাকায় তারা বোধহয় রক্ষণের ওপর একটু বেশিই নির্ভর করে।

এই দুই ডিফেন্ডারকে কিন্তু শুরু থেকে বেশ চাপে রেখেছিলেন রয়, গার্সিয়ারা। ৩৪ মিনিটের মাথায় মাঝমাঠে প্রণয়ের পাস থেকে বল নিয়ে পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে অনবদ্য একটি দূরপাল্লার শট নেন রয়, যা বারের ওপর দিয়ে চলে যায়। পরের মিনিটেই গার্সিয়াও একটি সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেও বিফলে যায়। এর দু’মিনিট পরেই বিপক্ষের গোলের সামনে সুযোগ পেয়েও তা কাজে লাগাতে পারেননি কেরলের দলের ফরোয়ার্ড বাংলার ঋত্বিক দাস। তিনি সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে বিপদে পড়তে হত সবুজ-মেরুন শিবিরকে।     

সাত-আট মাস পরে মাঠে নেমে দুই দলের ফুটবলারদেরই এ দিন বেশ জড়সড় লেগেছে। অগোছালো ফুটবল খেলেছে দুই দলই। শুধুমাত্র রয় কৃষ্ণা অনেকটা জং ছাড়িয়ে খেলার চেষ্টা করলেও গোলের লক্ষ্যে বারবার ব্যর্থ হন তিনি। গত মরশুমে গোলের রাস্তা যতটা ভাল চেনা ছিল তাঁর, এই মরশুমের প্রথম ৪৫ মিনিটে প্রথমার্ধে তা অচেনা লেগেছে ফিজির প্রাক্তন অলিম্পিয়ানের। শুধু তিনিই নন, প্রথমার্ধে গোলে একটাও শট নিতে পারেননি দুই দলের কোনও খেলোয়াড়ই। সেরা ফর্মে ফিরে আসতে সম্ভবত সময় লাগবে তাঁদের।

গত বছর বাংলার ফুটবলপ্রেমীদের মন ভরিয়ে দেওয়া প্রবীর দাসকেও এ দিন কিছুটা ফিকে লাগে। গত মরশুমে যে ভাবে বারবার উইং দিয়ে উঠে গোল তৈরি করেছিলেন প্রবীর, এ বার প্রথম ম্যাচে সে রকম ছবি দেখা গেল না। সুসাইরাজ প্রথমার্ধেই চোট পেয়ে বেরিয়ে যাওয়ায় হয়তো উইং প্লে বেশি না করার সিদ্ধান্ত নেন হাবাস। 

দ্বিতীয়ার্ধে দুই দলের খেলাতেই গতি বাড়লেও আগোছালো ভাব ছিলই। ৫০ মিনিটের মাথায় গোলের সামনে থেকে যে ভাবে মিস করলেন সাহাল আব্দুল সামাদ, তা অপ্রত্যাশিত। ম্যাচের শুরুতেই রয় যে ভাবে গোলের সুযোগ নষ্ট করেছিলেন, সামাদের এই মিস সেই ঘটনাকেই মনে করিয়ে দেয়।

এই ঘটনা দিয়েই দ্বিতীয়ার্ধে কেরালা ব্লাস্টার্স তাদের আক্রমণের ধার বাড়াতে শুরু করে। তবে বারবার গোল তৈরির চেষ্টা করেও ফিনিশ করতে পারছিলেন না। এই সময়ে আক্রমণে ধার ফিরিয়ে আনার জন্য এটিকে মোহনবাগানের কোচ মাঝমাঠ থেকে প্রণয় হালদারকে তুলে নিয়ে ফরোয়ার্ড মনবীর সিংকে নামান। গোলের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্যই এই সিদ্ধান্ত তাঁর। 

৬৩ মিনিটে এই পরিবর্তনেরই ফল তিনি পান চার মিনিটের মধ্যেই। বাঁ দিক থেকে বল নিয়ে বক্সে ঢুকে আসা মনবীরের ব্যাক পাস থেকে বাঁ পায়ে দুর্দান্ত গোল করেন রয় কৃষ্ণা। ম্যাচের শুরুতে যে সুযোগ নষ্ট করেছিলেন রয়, এ বার আর সেই ভুল করেননি। হিরো আইএসএলের প্রথম গোলটি করে গত মরশুমের স্মৃতি ফিরিয়ে আনেন তিনি।  

শেষ ১৫ মিনিটে গোল শোধ করার পরিকল্পনা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ফরোয়ার্ড জর্ডান মারে ও একই সঙ্গে ঋত্বিকের জায়গায় পুইতিয়াকেও নামান ভিকুনা। নতুন নিয়ম অনুযায়ী পাঁচজন পরিবর্ত খেলোয়াড়কে নামাতে পারেন কোচেরা। এ দিন এই নিয়মের ভরপুর সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেন কেরালা ব্লাস্টার্সের কোচ। পাঁচটি পরিবর্তনই করেন তিনি। তৃতীয় পরিবর্তনের পাল্টা সিদ্ধান্ত নেন হাবাসও, শেষ আট মিনিটের জন্য নামান ডেভিড উইলিয়ামসকে। তবে এই সিদ্ধান্তে আক্রমণে তেমন ধার বাড়েনি এটিকে মোহনবাগানের। এক গোলে জিতেই মাঠ ছাড়ে তারা।

এটিকে মোহনবাগান দল: অরিন্দম ভট্টাচার্য (গোল), প্রীতম কোটাল, তিরি, সন্দেশ ঝিঙ্গন, প্রবীর দাস, প্রণয় হালদার (মনবীর সিং), কার্ল ম্যাকহিউ, হাভিয়ে হার্নান্ডেজ, মাইকেল সুসাইরাজ (শুভাশিস বসু), এডু গার্সিয়া, রয় কৃষ্ণা (ডেভিড উইলিয়ামস)।

Your Comments

Your Comments