এটিকে-ঝড়ে আক্রান্ত এ বার জামশেদপুর, ফের শীর্ষে কৃষ্ণারা

শনিবার সারা দিন ধরেই কলকাতা ও তার আশেপাশের জেলাগুলি কেঁপেছে তীব্র সাইক্লোনের আতঙ্কে। সারা দিন ধরে ঝড়-বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত কলকাতার দল এটিকে এফসি-কে কিন্তু একেবারেই দমানো গেল না। জামশেদপুরকে ৩-১ গোলে হারিয়ে তারা ফের উঠে এল হিরো আইএসএল ২০১৯-২০-র লিগ টেবলের শীর্ষে। এ পর্যন্ত অপরাজিত জামশেদপুর এফসি-কে এই প্রথম হারের মুখ দেখতে হল কলকাতায় এসে।

প্রতিকুল পরিবেশে প্রথম ৪৫ মিনিটে বল দখলের লড়াইয়ের পরে ম্যাচের চারটি গোলই আসে দ্বিতীয়ার্ধে। এবং তার মধ্যে তিনটিই পেনাল্টি থেকে। এইটুকু পড়েই বুঝতে পারছেন কতটা নাটকীয় হয়ে উঠেছিল এই ম্যাচ। ১৫ মিনিটের মধ্যে দু’বার পেনাল্টি পেয়ে যায় এটিকে। দু’বারই মরিয়া রয় কৃষ্ণাকে বাধা দিতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে যান জামশেদপুরের ডিফেন্ডাররা। দু’বারেই গোল করেন তিনিই। ডেভিড উইলিয়ামসের ভুলে এর পর এটিকে একটি পেনাল্টি দিয়ে বসে বিপক্ষকে। তবে শেষ দিকে নামা পরিবর্ত ফরোয়ার্ড এডু গার্সিয়ার শেষ মুহূর্তের গোলে জয় সুনিশ্চিত করে ফেলে কলকাতার দল।

  • ৫৫ মিনিটে দ্রুত বক্সে ঢুকে পড়া রয় কৃষ্ণার পায়ে সরাসরি আঘাত করেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার তিরি। অবধারিত ভাবে পেনাল্টি। ডানদিক দিয়ে সুব্রতকে পরাস্ত করতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি কৃষ্ণার।
  • প্রায় দশ মিনিট পরে ফের কৃষ্ণাকে আটকাতে গিয়ে পেনাল্টি দিয়ে ফেলে জামশেদপুর। ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার মেমো বক্সের মধ্যে ডান দিক থেকে তাঁকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন। রেফারি রাহুল গুপ্তা পেনাল্টি দেন। প্রথম শট নাকচ হওয়ার পরে দ্বিতীয় বার বাঁ দিকের পোস্টে লেগে বল ঢুকে যায় গোলে।
  • ৮৫ মিনিটের মাথায় ডেভিড উইলিয়ামস অনর্থক বক্সের মধ্যে নোয়ে আকোস্তাকে ধাক্কা মারায় পেনাল্টি দেন রেফারি। নিখুঁত শট নেন ২৫ বছর বয়সি স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড সের্জিও ক্যাস্টেল।
  • স্টপেজ টাইমে ডান দিক থেকে উইলিয়ামস এরিয়াল বল পাঠান বাঁ দিকে কৃষ্ণাকে। কৃষ্ণা বল দেন মাঝখান দিয়ে ওঠা গার্সিয়াকে। অসাধারণ ফিনিশ করেন ২৯ বছর বয়সি স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড।

শনিবার ভোর-রাত থেকে চলে টানা বৃষ্টি ও ম্যাচের সময়ও সেই বৃষ্টি হয় অনবরত। যার ফলে মাঠ এতটাই পিছল হয়ে পড়েছিল যে, দেহের ভারসাম্যই ঠিকমতো বজায় রাখতে পারছিলেন না ফুটবলাররা। বাঁ দিকের উইং বরাবর আক্রমণে উঠতে গিয়ে একাধিকবার পা পিছলে পড়ে যেতে দেখা যায় মাইকেল সুসাইরাজকে। ঠাণ্ডা হাওয়া ও বৃষ্টি, সব মিলিয়ে আবহাওয়ার অবস্থা বেশ প্রতিকূল ছিল। এই অবস্থায় গতিময় ফুটবল খেলা বেশ কঠিন। পাসিং, জোরে শট নেওয়া, দ্রুত আক্রমণে ওঠা, কোনওটাই সহজ ছিল না।

এর মধ্যেই রয় কৃষ্ণারা আক্রমণের গতি বাড়ানোর চেষ্টা করেন প্রথম ৪৫ মিনিট ধরে। সুসাইরাজের প্রাক্তন ক্লাব জামশেদপুর এফসি শুরুর দিকে বলের পজেশন বাড়িয়ে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও তা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেনি। এটিকে-র গোলকিপার অরিন্দম ভট্টাচার্যকে সে ভাবে বল ধরতেই হয়নি প্রথমার্ধে। বরং অরিন্দমের সোদপুরের প্রতিবেশী ও জামশেদপুরের ফর্মে থাকা গোলকিপার সুব্রত পালকে বেশ কয়েকবার চাপে ফেলে দিয়েছিল এটিকে।

শুরুতেই গোলের সামনে বল ক্লিয়ার করতে গিয়ে ডেভিড উইলিয়ামস একেবারে সামনে এসে পড়ায় বিপদের মুখে পড়েন সুব্রত। প্রথমার্ধের মাঝামাঝি ডান দিক থেকে প্রবীর দাসের ক্রসে ঠিকমতো মাথা ছোঁয়াতে পারলে ডেভিড উইলিয়ামস হয়তো তাঁর লিগের চতুর্থ গোলটি পেয়ে যেতেন অবধারিত ভাবে।

হাভিয়ে হার্নান্ডেজের সঙ্গে দুর্দান্ত বোঝাপড়ায় বাঁ দিকের উইং দিয়ে বারবার আক্রমণ তৈরি করছিলেন সুসাইরাজ। ২২ মিনিটের মাথায় পরিস্থিতি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। কিন্তু গোলের সামনে গিয়ে বল সুব্রতর গ্লাভসে জমা করে দেওয়ায় সুসাইরাজের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

প্রথমার্ধের শেষ দিকে জামশেদপুরের স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পিটি একটি বল ব্লক করতে গিয়ে ঊরুতে চোট পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যাওয়ায় তাঁর দল কিছুটা হলেও সমস্যায় পড়ে যায়। পিটি যে ভূমিকা পালন করছিলেন, সেটা জামশেদপুরকে অনেকটা শক্তি জোগাচ্ছিল। কিন্তু তিনি মাঠ ছেড়ে চলে যাওয়ার পরেই সেই শক্তিতে ভাটা পড়ে।

সারা ম্যাচে মাত্র একটি পজিটিভ সুযোগ তৈরি করতে পারে জামশেদপুর। যে দিক থেকে বেশ এগিয়ে ছিল এটিকে। তাদের সেরা ফরোয়ার্ড উইলিয়ামসের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স এ দিন ছিল প্রশংসা করার মতো। এ দিন একটু পিছন থেকে খেলছিলেন উইলিয়ামস। কিন্তু সারা মাঠ জুড়ে খেলছিলেন তিনি। যেখানেই বল গিয়েছে, সেখানেই উইলিয়ামসকে দেখা গিয়েছে এ দিন। ওঠা-নামা করে সারা মাঠ জুড়ে অলরাউন্ড ফুটবল খেলতে দেখা যায় তাঁকে। সম্ভবত এই ম্যাচে তাঁকে এই ভূমিকা পালন করারই নির্দেশ দিয়েছিলেন কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাস।

নির্বাসন কাটিয়ে ফিরে আসা জবি জাস্টিনকে এ দিন শুরু থেকে মাঠে না নামিয়ে হাবাস নামান জয়েশ রানেকে। তবে তিনি ততটা কার্যকর হয়ে উঠতে পারেননি। আক্রমণ বিভাগকে বল সাপ্লাই দেওয়ার ক্ষেত্রে খুব একটা তৎপর হতে দেখা যায়নি তাঁকে। হয়তো প্রতিকুল পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছিল তাঁর। আই লিগে ন’টি গোল করে সর্বোচ্চ স্কোরারের খেতাব পাওয়া জবিকে হাবাস এ দিন নামান ৭৯ মিনিটের মাথায়, সুসাইরাজের জায়গায়। তখন দুই গোলে এগিয়ে এটিকে এবং ওপরের দিকে খেলছিলেন এডু গার্সিয়া। আইএসএল অভিষেক কেরালার তারকা ফরোয়ার্ডের তেমন জম্পেশ হল না।

দ্বিতীয়ার্ধে বৃষ্টির গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এটিকে-র আগ্রাসনও ক্রমশ বাড়তে থাকে। খেলার গতি বাড়িয়ে বারবার আক্রমণে ওঠার এই প্রবণতা দুশ্চিন্তা বাড়িয়ে তোলে জামশেদপুরের। বিপক্ষকে রুখতে এতটাই মরিয়া হয়ে ওঠেন তাঁরা যে মাঝমাঠ থেকে বল নিয়ে মাঝখান দিয়ে দ্রুত বক্সে ঢুকে পড়া রয় কৃষ্ণার পায়ে সরাসরি আঘাত করেন স্প্যানিশ ডিফেন্ডার তিরি। অবধারিত ভাবে পেনাল্টি। ডানদিক দিয়ে সুব্রতকে পরাস্ত করতে বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয়নি কৃষ্ণার।

দশ মিনিট পরে আবার কৃষ্ণাকে আটকাতে গিয়ে ফের পেনাল্টি দিয়ে ফেলে জামশেদপুর। এ বারও বক্সের মাঝখান দিয়ে ঢুকছিলেন ফিজির প্রাক্তন অলিম্পিয়ান কৃষ্ণা। প্রথমে পিছন থেকে তাঁর বুকে পা চালান তিরি। তাতেও যখন দামানো গেল না কৃষ্ণাকে, তখন ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার মেমো বক্সের মধ্যে ডান দিক থেকে তাঁকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেন। রেফারি রাহুল গুপ্তা পেনাল্টির সিদ্ধান্ত নিতে বিন্দুমাত্র সময় নেননি। পেনাল্টি নিতে গিয়েও নাটক। প্রথম শটে ডান দিক থেকে বল জালে জড়িয়ে দিলেও রেফারি ফের কৃষ্ণাকে শট নিতে বলেন। দ্বিতীয় বার বাঁ দিকের পোস্টে লেগে বল ঢুকে যায় গোলে।

ম্যাচ জমে ওঠে জামশেদপুরও পেনাল্টি থেকে গোল পাওয়ায়। ডেভিড উইলিয়ামস অনর্থক বক্সের মধ্যে নোয়ে আকোস্তাকে ধাক্কা মারায় পেনাল্টি দেন রেফারি। নিখুঁত শট নেন ২৫ বছর বয়সি স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড সের্জিও ক্যাস্টেল। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার ঠিক এক মিনিট আগে পরিবর্ত ফরোয়ার্ড এডু গার্সিয়া গোলে বিপজ্জনক শট নিয়েছিলেন, কিন্তু তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। কিন্তু দু’মিনিট পরেই ডেভিড উইলিয়ামস ও রয় কৃষ্ণা যে গোলটা নিখুঁত ভাবে সাজিয়ে দেন তাঁকে, তাতে একেবারেই ব্যর্থ হননি এটিকে-র দশ নম্বর জার্সির মালিক। ডান দিক থেকে উইলিয়ামস এরিয়াল বল পাঠান বাঁ দিক দিয়ে ওঠা কৃষ্ণাকে। মাঝখান দিয়ে উঠছিলেন গার্সিয়া। কৃষ্ণা নিজে না এগিয়ে তাঁকে বল দেন এবং অসাধারণ ফিনিশ করেন ২৯ বছর বয়সি স্প্যানিশ ফরোয়ার্ড।

এটিকে-র এখন শুধু সামনের দিকে তাকানোর পালা। চার ম্যাচে ৯ পয়েন্ট নিয়ে হাবাসের দল এখন লিগ টেবলের এক নম্বরে। সাত পয়েন্ট নিয়ে জামশেদপুর চারে। প্রথম চারে তাদের থাকার সম্ভাবনার ইঙ্গিত এখন থেকেই বোধহয় দিয়ে রাখল এটিকে।

Your Comments

Your Comments