দীর্ঘ জীবনযুদ্ধের পর প্রয়াত ফুটবল কিংবদন্তি পি কে ব্যানার্জি

নিভে গেল ভারতীয় ফুটবলের প্রদীপ। চলে গেলেন কিংবদন্তি প্রদীপ কুমার ব্যানার্জি। যাঁকে সারা দেশের ফুটবল মহল পিকে ব্যানার্জি নামে চেনে। কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে দীর্ঘ রোগভোগ ও জীবন-মরণ যুদ্ধের পরে শুক্রবার দুপুর ২.০৮-এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছেল ৮৩। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে তিনি কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্রের ভরসায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করছিলেন। বৃহস্পতিবার রাতেই হাসপাতাল থেকে মেডিক্যাল বুলেটিনে জানানো হয়, তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক। শুক্রবার দুপুরে জানানো হল, সেই জীবনযুদ্ধ শেষ। রেখে গেলেন দুই কন্যা এবং ভাই ও আর এক ফুটবল ব্যক্তিত্ব প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়কে।  

এত দিন ধরে বাংলা তথা বহু ভারতীয় ফুটবলারকে যিনি তাঁর বিখ্যাত ভোকাল টনিকদিয়ে উজ্জীবিত করে রাখতেন, সেই পিকে ব্যানার্জি এ দিন জীবনের শেষ যুদ্ধে হেরে গেলেন। গত কয়েক বছর ধরে হুইল চেয়ার ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। হাসপাতালেও ভর্তি হয়েছেন একাধিকবার। শেষ বার হাসপাতালে ভর্তি হন গত ৭ ফেব্রুয়ারি। ভুগছিলেন সেপসিস, নিউমোনিয়া, পারকিনসন্স ও হৃদরোগে এবং তা থেকে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ক্রমশ বিকল হয়ে যায়। গত দু-তিন ধরে তাঁর ডায়ালিসিসও হয়। প্রায় দেড় মাসের যুদ্ধ শেষ হল শুক্রবার দুপুরে।

বাংলার ফুটবলার হয়েও কখনও ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান বা মহমেডান স্পোর্টিংয়ের মতো বড় ক্লাবে খেলেননি। এরিয়ান্স ও ইস্টার্ন রেলের মতো তথাকথিত স্বল্পপরিচিত দলের হয়ে ফুটবল খেলেই ভারতীয় ফুটবলের তারকা হয়ে ওঠেন ১৯৩৬-এর ২৩ জুন জলপাইগুড়িতে জন্মগ্রহণ করা প্রদীপ কুমার ব্যানার্জি। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিহারের হয়ে সন্তোষ ট্রফিতে প্রথম খেলার সুযোগ পান তিনি। পরে পরিবারের সঙ্গে কলকাতায় চলে আসায় এরিয়ান্স ক্লাবে যোগ দেন তিনি। ১৯৫৫-য় ফুটবলার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন ইস্টার্ন রেলে। ১৯৫৮-য় তাঁর নেতৃত্বেই ইস্টার্ন রেল তিন প্রধানকে পিছনে ফেলে কলকাতা লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এক বিরল নজির সৃষ্টি করে। যে নজির গত বছরই ভেঙে নতুন নজির গড়ে পিয়ারলেস ফুটবল ক্লাব। রেলের সামান্য বেতনে সাত ভাই-বোনের সংসার চালিয়েও নিজের ফুটবল সাধনায় কখনও অবহেলা করেননি তিনি।

মাত্র ১৯ বছর বয়সে দেশের জার্সি গায়ে তিনি প্রথম মাঠে নামেন ১৯৫৫ সালে ঢাকায়। ১৯৫৬-য় মেলবোর্ন অলিম্পিকে যে ভারতীয় দল গিয়েছিল, সেই দলে ডাক পেয়েছিলেন তিনি। কোায়ার্টার ফাইনালে আয়োজক অস্ট্রেলিয়াকে ৪-২ গোলে হারায় ভারত। নিজে গোল না পেলেও হ্যাটট্রিকের নায়ক নেভিল ডিসুজাকে গোল করতে সাহায্য করেন তিনি। একটি গোল করেন জে কৃষ্ণাস্বামী। ভারত সে বার চতুর্থ স্থানে শেষ করে, অলিম্পিকে যা দেশের ফুটবল দলের সেরা ফল। পরের অলিম্পিকে (১৯৬০, রোম) পিকে ছিলেন ভারতের অধিনায়ক। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ভারতের ১-১ ড্রয়ে একমাত্র গোলটি করেছিলেন তিনিই। তবে আগেরবারের মতো সফল হতে পারেনি ভারত। 

এশিয়ান গেমসে তিনি প্রথম নামেন ১৯৫৮ সালে। ১৯৬২-র জাকার্তা এশিয়াডে ভারত সোনা জিতেছিল। সেই দলে পিকে ছাড়া ছিলেন চূনি গোস্বামী, তুলসীদাস বলরাম, পিটার থঙ্গরাজ, জার্নেল সিংদের মতো কিংবদন্তিরাও। ফাইনালে অপ্রতিরোধ্য দক্ষিণ কোরিয়াকে ২-১ গোলে হারায়। জার্নেল ও পিকে করেছিলেন গোলগুলি। পরের এশিয়াডেও খেলেছিলেন তিনি।  ১৯৫৯ ও ১৯৬৪-তে মারডেকা কাপে ভারতকে রুপো ও ১৯৬৫-তে ব্রোঞ্জ জিততেও সাহায্য করেছিলেন বাংলার এই প্রবাদপ্রতীম ফুটবলার।  ভারতের হয়ে মোট ৮৪টি ম্যাচ খেলে ৬৫ গোল করেছেন তিনি। যে সময়ে পাঁচ ফরোয়ার্ডে খেলার চলই ছিল বেশি, সেই সময়ে রাইট উইঙ্গার ও সেন্টার ফরোয়ার্ড এই দুই ভূমিকাই পালন করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেন পিকে। 

বড় ক্লাবে না খেলেও যে বড় ক্লাবের সফল কোচ হওয়া যায়, তা প্রমাণ করেছিলেন তিনি। ১৯৬৭-তে অবসর নেওয়ার পরে ভারতীয় দলের কোচ হন তিনি। তাঁর তত্বাবধানেই ভারতীয় ফুটবল দল ১৯৭০-এ ব্যাঙ্ককে সোনা জিতেছিল। তার পরে আর এশিয়াডে ফুটবল থেকে কোনও পদক আনতে পারেনি ভারত।  ১৯৭৪, ১৯৮২ ও ১৯৮৬-র এশিয়াডেও তিনি ভারতীয় দলের কোচ ছিলেন।

১৯৭২-এ ইস্টবেঙ্গলে কোচ হিসেবে যোগ দিয়ে ময়দানে ক্লাব কোচিং শুরু করেন তিনি। ১৯৭৫-এ ইস্টবেঙ্গলকে কলকাতা লিগে চ্যাম্পিয়ন করেন। পরের মরশুমেই পিকে মোহনবাগানে কোচ হিসেবে যোগ দিয়ে তাদের সেবার চ্যাম্পিয়নের খেতাব এনে দেন। সেই সময় থেকেই তাঁর বিখ্যাত ভোকাল টনিকের জনপ্রিয়তা শুরু। ১৯৭৬-এ মোহনবাগানকে ডুরান্ড কাপ, রোভার্স কাপ ও ফেডারেশন কাপের ত্রিমুকুট এনে দেন কোচ পিকে। টাটা ফুটবল অ্যাকাডেমির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর পদেও একসময় ছিলেন তিনি।

ইস্টবেঙ্গলেই কোচিং জীবনের বেশিরভাগ কাটান তিনি এবং তাদের প্রায় ৩০টি ট্রফি এনে দেন পিকে ব্যানার্জি। ১৯৯৭-এ ফেডারেশন কাপে তাঁর ও মোহনবাগান কোচ অমল দত্তের বাগযুদ্ধ এখন দেশের ফুটবলের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক অধ্যায় হয়ে রয়ে গিয়েছে। সেমিফাইনালে মাঠের বাইরের সেই যুদ্ধ চরমে ওঠে দুই প্রধান মুখোমুখি হওয়ায়। ১.২০ লক্ষ দর্শকে ঠাসা যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে সেই ম্যাচে পিকে-র ইস্টবেঙ্গল ৪-১ গোলে হারিয়েছিল মোহনবাগানকে। সেই সময়ে ভারতীয় ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা বাইচুং ভুটিয়ার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল পিকে-র।

দেশের অন্যতম দুই সেরা সরকারি সম্মান পদ্মশ্রী ও অর্জুন পাওয়ারর পাশাপাশি বিশ্ব ফুটবলের অভিভাবক সংস্থা ফিফা ২০০৪ সালে তাঁকে সেন্টেনিয়াল অর্ডার অব মেরিট সম্মান দেয়, যা তাঁকে বিংশ শতাব্দীর সেরা ভারতীয় ফুটবল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।  তিনিই দেশের প্রথম ফুটবলার, যিনি অর্জুন সম্মান পান।  

একদা তাঁর সতীর্থ তুলসীদাস বলরাম, চূনি গোস্বামী এবং তাঁর কোচিংয়ে গড়ে ওঠা তারকা ফুটবলার সুব্রত ভট্টাচার্য, শ্যাম থাপা, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, গৌতম সরকার, মনরঞ্জন ভট্টাচার্যরা তাঁদের গুরুর প্রয়াণে শোকস্তব্ধ। অবাক করার মতো হলেও সত্যি যে, তাঁর অন্যতম প্রিয় ছাত্র কৃশানু দে-র মৃত্যুও ১৭ বছর আগে একই দিনে হয়েছিল।

ভারতীয় ফুটবলের এই সুসময়ে, যখন দেশের ফুটবল ক্রমশ উন্নতির পথ ধরে এগোচ্ছে, তখন পিকে ব্যানার্জির মতো কিংবদন্তির প্রয়াণে মর্মাহত হিরো ইন্ডিয়ান সুপার লিগ এবং তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে লিগের উদ্যোক্তা ফুটবল স্পোর্টস ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড।

Your Comments

Your Comments