গত ম্যাচে নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি-র বিরুদ্ধে ৫-০ জয়ের পর ইস্টবেঙ্গল শিবির আত্মবিশ্বাসে টগবগ করে ফুটলেও তাদের কোচ কার্লস কুয়াদ্রাত কিন্তু সতর্ক। এই আত্মবিশ্বাস যেন আত্মতুষ্টিতে পরিণত না হয়। তাই দলের ছেলেদের তিনি সাবধান করে দিচ্ছেন, আবেগে ভেসে না গিয়ে যেন নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করেন তাঁরা।
কোচের মতে, টানা চার ম্যাচে জয় না পাওয়ার পরে একট বড় জয়ের ফলে দল ও সমর্থকেরা উচ্ছ্বসিত ঠিকই। কিন্তু এই একটা বড় জয়ে কিছু আসে যায় না। জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখাটাই আসল ব্যাপার। সে জন্য ফুটবলারদের প্রতি তাঁর বার্তা, ‘মাটিতে পা রেখে পরিশ্রম করে যাও। তা হলেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে’।

শনিবার ঘরের মাঠে ফের একটা ম্যাচ খেলতে নামছে ইস্টবেঙ্গল এফসি। এ বার প্রতিপক্ষ লিগ টেবলের একেবারে নীচে থাকা পাঞ্জাব এফসি, যারা এখনও পর্যন্ত একটিও জয় পায়নি। কিন্তু গত ম্যাচে কান্তিরাভা স্টেডিয়ামে বেঙ্গালুরু এফসি-র বিরুদ্ধে ৩০ মিনিটের মধ্যে ৩-১ গোলে এগিয়ে যায় তারা। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ ৩-৩ ড্র হলেও ওই ম্যাচে ইস্টবেঙ্গলকে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছোঁড়ার বার্তা দিয়ে রাখে তারা।

সে জন্যই সতর্ক ইস্টবেঙ্গল শিবির। এমনিতেই ঘরের মাঠে তাদের রেকর্ড মোটেই ভাল না। তার ওপর একাধিক ম্যাচে এগিয়ে গিয়েও পরে হারা বা ড্র করার ঘটনা ঘটেছে তাদের সঙ্গে। তাই পাঁচ গোলে জয়ের আতিশয্যে ভেসে গিয়ে পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে পয়েন্ট খোয়াতে রাজি নন তিনি।

খাতায় কলমে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নামার আগে ইস্টবেঙ্গলের স্প্যানিশ কোচ বলেন, “আমরা বাস্তবের মাটিতে পা রেখে চলি। আমরা কী করেছি জানি, ঘরের মাঠে একটা ম্যাচ জিতেছি। চারটে ম্যাচ না জেতার পরেও একটা জয় একটা দলকে সাফল্যে ফেরাতে পারে। তবে আমরা সচেতন। নিজেদের কাজটা ঠিকমতো করে যেতে হবে। কাল আবার আমরা সমর্থকদের সামনে নামব নিজেদের অপরাজিত রাখতে ও আরও তিন পয়েন্ট অর্জন করতে। আমি খুশি এই কারণে যে, আমার দলের ছেলেরা খেলাটা উপভোগ করছে। কারণ, পেশাদার ফুটবলে খুব মানসিক চাপ থাকে। সেটা কাটানোর জন্য খেলাটা উপভোগ করা খুবই জরুরি। সমর্থকেরাও খুশি। তবে এখনও অনেক কাজ বাকি। আমাদের সেগুলো করতে হবে”।

পাঞ্জাব এফসি লিগ টেবলের একেবারে নীচের দিকে থাকলেও তাদের প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল লাল-হলুদ কোচ। বলেন, “পাঞ্জাব ভাল দল। ওরা কয়েকমাস আগেই আই লিগ জিতে এসেছে। ওদের সেই দলের অনেককেই ওরা রেখে দিয়েছে। ওদের খুব ভাল কোচ আছেন। ওদের বিদেশি ফুটবলাররাও ভাল। বেঙ্গালুরুর বিরুদ্ধে ওরা খুব ভাল খেলেছিল। ওরা এগিয়েছিল সেই ম্যাচে”।

প্রতিপক্ষে যে কয়েকজন ভাল ফুটবলার রয়েছেন, তা মনে করিয়ে দিয়ে কুয়াদ্রাত বলেন, “ওদের বিরুদ্ধে নেমে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ওরা আটটা ম্যাচে জিততে পারেনি। একটা জয়ের জন্য ওরা এখন মরিয়া। ওদের সুযোগ দিলে ওরা তা কাজে লাগাবেই। তাই ওদের সুযোগ দেওয়া যাবে না। আমাদেরও সুযোগ হাতছাড়া করলে চলবে না। জুয়ান মেরা ওদের দলের একজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়। ওর টেকনিক্যাল দক্ষতা, ড্রিবলিং খুবই ভাল। তবে ওদের দলে আরও ভাল ভাল খেলোয়াড় আছে। লুকা (মাজেন) নিয়মিত গোল করছে, (মাদি) তালালও যথেষ্ট ভাল ফুটবলার। গোলের সুযোগ তৈরি করে ভাল। এদের বিরুদ্ধে অসতর্ক হলেই সমস্যায় পড়তে হবে”।

ইস্টবেঙ্গল ছন্দে ফিরলেও তাদের শিবিরে একটা দুঃসংবাদ এসেছে সম্প্রতি। নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার হরমনজ্যোৎ সিং খাবরা হাঁটুতে চোট পেয়ে বেশ কয়েক দিনের জন্য মাঠের বাইরে চলে গিয়েছেন। কবে মাঠে ফিরতে পারবেন তিনি, তা নিশ্চিত করে বলতে পারলেন না কোচ নিজেও। বলেন, “আমরা চেষ্টা করছি খাবরার চোটটা সঠিক ভাবে নির্ধারণ করে যাতে সঠিক চিকিৎসা করা যায়। ওর হাঁটুতে সম্ভবত একটা জায়গায় আংশিক চিড় ধরেছে। কী পদ্ধতিতে চিকিৎসা করলে ও দ্রুত সেরে উঠবে, সেই ব্যাপারে আমরা ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলছি”।

খাবরার অভাব যে যথেষ্ট অনুভব করবেন, তা জানিয়ে বলেন, “শুধু খেলোয়াড় হিসেবে যে ওর অভাব অনুভব করব, তা নয়, ও একজন ভাল মানুষ এবং যথার্থ নেতা। আমাদের ড্রেসিং রুমে ও খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য। দলে ওর মতো ভাল নেতা থাকাটা খুবই জরুরি। মাঠে না থেকেও ও দলকে অন্য ভাবে সাহায্য করে। ওর মাঠে ফেরার অপেক্ষায় থাকব”।

আইএসএলের ইতিহাসে পাঁচ বা তার বেশি ব্যবধানে জয়ের ঘটনা খুব বেশি নেই। গত মরশুমে মাত্র একটি ম্যাচে হায়দরাবাদ এফসি এই নর্থইস্ট ইউনাইটেডকেই ৬-১-এ হারিয়েছিল। তার আগের মরশুমে, অর্থাৎ ২০২১-২২-এ এফসি গোয়া পাঁচ গোল করেছিল চেন্নাইন এফসি-র বিরুদ্ধে, সেবারেও হায়দরাবাদ ৫-০-য় জিতেছিল নর্থইস্টের বিরুদ্ধে এবং সেই হায়দরাবাদই ৬-১-এ জিতেছিল ওডিশা এফসি-র বিরুদ্ধে। তবে আইএসএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে জয় পেয়েছিল এফসি গোয়া, ২০১৫-য়। সে বার তারা মুম্বই সিটি এফসি-কে ৭-০-য় হারায়। ইস্টবেঙ্গলের পাঁচ গোলে জয় ছাড়াও অতীতে এই লিগে আরও সাতটি ম্যাচে ৫-০ হয়েছে। ৬-১ ফলও হয়েছে চারবার।

দলের খেলোয়াড়দের মাটিতে পা রাখার উপদেশ দিলেও পাঁচ গোলে জয়কে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন কুয়াদ্রাত। তিনি বলেন, “একটা দল টানা হারতে থাকলে বা জিততে না পারলে, তাদের আত্মবিশ্বাস স্বাভাবিক ভাবেই কমে যায়। সারা দুনিয়ার ফুটবলেই এটা হয়ে থাকে। আমি খুশি যে আমরা একটা বড় জয় পেয়েছি, যা গত কয়েক বছরে হয়ে ওঠেনি, বোধহয় ২০১৯-এর আই লিগে শেষবার আমরা এরকম বড় জয় পেয়েছিলাম। তাই আত্মবিশ্বাস অনেকটাই বেড়েছে আমাদের”।

সমর্থকদের আনন্দ দিতে পেরে অবশ্য বেশি খুশি আইএসএল খেতাব জয়ী কোচ। বলেন, “অনেক বছর পর সেই হাসিটা তো ফের আনতে পেরেছি সমর্থকদের মুখে। এটাই বড় কথা। এর আগে আমরা ডুরান্ডের ফাইনালে উঠেছি, কিন্তু ট্রফি জিততে পারিনি। অনেক দিন পর ডার্বিতে জিতেছি। সমর্থকেরা আনন্দ পেয়েছেন। এটাও তো দরকার। এ বার ইস্টবেঙ্গলকে ফের আগের মতো শক্তিশালী করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। তবে একটা পাঁচ গোলে জয় কিছুই না। আমাদের পরিশ্রম করে যেতে হবে, যাতে এ রকম জয় আরও আসে, যাতে আমাদের পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা আসে। তা হলে আমাদের সমর্থকেরা আরও আনন্দ পাবেন”।

প্রতিপক্ষ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তাঁদের গত ম্যাচের উদাহরণ টানেন লাল-হলুদ কোচ। বলেন, “নর্থইস্ট যথেষ্ট ভাল দল, তা সত্ত্বেও আমরা ওদের আধিপত্য বিস্তার করে হারিয়েছি। ফুটবলে একটা গোল বা একটা পেনাল্টিই একটা ম্যাচের রঙ পুরো বদলে দিতে পারে। ওরা যেমন সেদিন একটা পেনাল্টি পেয়েও সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেনি। ওরা যদি গোলটা করত, তা হলে পরিস্থিতি বদলে যেত। পাঞ্জাবের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা অনেকটা সে রকমই। ওদের প্রতি আমরা যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। ওরা এখানে ম্যাচটা জেতার চেষ্টা করবেই। আমাদের ফোকাস বজায় রাখতে হবে। গত ম্যাচে যে রকম ছিল। আশা করি, এই ম্যাচ থেকে আরও একটা ভাল জয় আমরা পাব”।

দলের তরুণ ফরোয়ার্ড বিষ্ণু পুথিয়ার প্রশংসা করে কুয়াদ্রাত বলেন, “বিষ্ণু আমাদের দলে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। স্থানীয় লিগ থেকে উঠে এসে আইএসএলে খেলা মোটেই সোজা কাজ নয়। এর মধ্যে ও যেটুকু সুযোগ পেয়েছে, তা সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে পেরেছে বলেই আমার মনে হয়। ওকে যদি ঠিকমতো তৈরি করা যায়, তা হলে আরও উন্নতি করবে”।