টিম প্রিভিউ: রক্ষণের পরিকল্পনা বোঝা গেলেও এটিকে মোহনবাগানের আক্রমণ-নীতি ধোঁয়াশায় ঢাকা

গত মরশুমের হিরো আইএসএল সেমিফাইনালের স্মৃতি টেনে এনে লেখাটা শুরু করা যেতে পারে। চ্যাম্পিয়ন হায়দরাবাদ এফসি-র বিরুদ্ধে প্রথম সেমিফাইনালে কয়েক মুহূর্তের ভুলে যে হার স্বীকার করতে হয়েছিল এটিকে মোহনবাগানকে, সেই ভুলগুলি শুধরে ফিরতি সেমিফাইনালে তাদের অন্তত তিন গোলের ব্যবধানে জিততেই হত। এ রকম একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে দ্বিতীয় সেমিফাইনালে নেমে ১-০-য় জেতে তারা।

এ পর্যন্ত পড়ে অনেকের মনে হতে পারে, সবুজ মেরুন শিবিরের ব্যর্থতাই তাদের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছিল সে দিন। কিন্তু সত্যিই কি ব্যর্থ ছিল তারা? এই ওয়েবসাইটে ‘সার্চ’ করে সে দিনের ম্যাচ রিপোর্টের কয়েক লাইন যদি পড়ে নিতে পারেন, তা হলে বুঝবেন, ঠিক কতটা ‘ব্যর্থ’ ছিল সবুজ-মেরুন শিবির।  

‘একশো মিনিটেরও বেশি হায়দরাবাদ এফসি-কে কোণঠাসা করে রেখে দেয় এটিকে মোহনবাগান। এর চেয়ে দাপুটে পারফরম্যান্স সারা লিগে তারা আর কখনও দেখাতে পেরেছে কি না সন্দেহ রয়েছে’, লেখা হয়েছিল সেই ম্যাচের রিপোর্টে।

ম্যাচ রিপোর্টে আর একটু এগোলে দেখবেন, সবুজ-মেরুন বাহিনী সম্পর্কে এক জায়গায় লেখা আছে, ‘বাম্বোলিমে হিরো আইএসএল সেমিফাইনালের দ্বিতীয় লেগে অন্তত চার গোলে জিতে ফাইনালে দুর্ধর্ষ এক বাংলা-কেরালা দ্বৈরথে নামতে পারত তারা’।

কিন্তু কেন পারেনি তারা? এই প্রশ্নেরও উত্তর পেয়ে যাবেন সেই ম্যাচ রিপোর্টে। কী সেই উত্তর? ‘গতবারের রানার্স আপ দলের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ান হায়দরাবাদ এফসি-র ৩২ বছর বয়সি গোলকিপার লক্ষ্মীকান্ত কাট্টিমণি, যিনি একাই ছ-ছ’টি অবধারিত গোল সেভ করে এটিকে মোহনবাগানের ফাইনালে ওঠার রাস্তা বন্ধ করে দেন’।

‘সারা ম্যাচে আটটি শট গোলে রাখেন কলকাতার দলের ফুটবালাররা। কিন্তু একটির বেশি গোল পাননি তাঁরা। পেতে পারতেন অন্তত তিন-চারটি। যে সমস্ত গোলের সুযোগ হাতছাড়া করেছেন লিস্টন কোলাসো, রয় কৃষ্ণা, হুগো বুমৌস, জনি কাউকোরা, তা তাঁদের কাছ থেকে অপ্রত্যাশিত। ১৩টি কর্নার পেয়েও সেগুলি বিফলে যায়। সারা ম্যাচে বিপক্ষের বক্সে ৩২টি ক্রস উড়ে গেলেও মাত্র একটি কাজে লাগে তাদের’, বলছে সে দিনের ম্যাচ রিপোর্টে।

সে দিন যে জায়গায় শেষ করেছিল এটিকে মোহনবাগান, নতুন মরশুমে সেই জায়গা থেকে শুরু করতে পারবে তারা? এটাই এখন ক্লাবের সমর্থকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

দাপটের ধারাবাহিকতা

গত মরশুমে হিরো আইএসএলেই শেষ হয়ে যায়নি এটিকে মোহনবাগানের অভিযান। তার পরেও তারা এশীয় মঞ্চে নিজেদের মেলে ধরেছে এবং সেখানেও রীতিমতো দাপট বজায় ছিল তাদের। এপ্রিলে তারা শ্রীলঙ্কার ব্লু স্টার ও ঢাকার আবাহনী লিমিটেডকে হারিয়ে গ্রুপ পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। মে মাসে গ্রুপ পর্বে তারা গোকুলম কেরালা এফসি-র কাছে ২-৪-এ হারলেও বাংলাদেশের বসুন্ধরা কিংসকে ৪-০ ও মলদ্বীপের মাজিয়া এসআর-কে ৫-২-এ হারিয়ে ইন্টার জোনাল সেমিফাইনালে ওঠে। যে মোকাবিলায় তাদের নামতে হবে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর, ঘরের মাঠ যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনেই।

হিরো আইএসএলের সেমিফাইনাল থেকে ছিটকে গেলেও এটিকে মোহনবাগানের যে গতবারও ফাইনালে ওঠার ক্ষমতা ছিল, তার প্রমাণ তারা দ্বিতীয় সেমিফাইনালেই দিয়ে দেয়। তবে এ বার তাদের চ্যালেঞ্জটা আরও কঠিন। একে তো আরও লম্বা ঘরোয়া ক্লাব মরশুম। এ বারে আর শুধু হিরো আইএসএল খেললেই চলবে না, এ ছাড়াও আগামী সপ্তাহ থেকে ডুরান্ড কাপ এবং আগামী বছর এপ্রিল-মে মাসে সুপার কাপও খেলতে হবে তাদের।

তাই এ বার দলের খোলনলচে পাল্টে ফেলেছেন সবুজ-মেরুন বাহিনীর স্প্যানিশ কোচ হুয়ান ফেরান্দো। দলকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টায়, একটা নির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী দলে নতুন খেলোয়াড় নিয়ে এসেছেন তিনি ও ক্লাবের কর্তারা।

নতুন মরশুম, নতুন রক্ষণ

সমর্থকদের দুই নয়ণের মণি রয় কৃষ্ণা ও ডেভিড উইলিয়ামসকে যেমন বিদায় দিয়েছে এটিকে মোহনবাগান, তেমনই ডিফেন্ডার সন্দেশ ঝিঙ্গনকেও অব্যহতি দিয়েছে তারা। আরেক নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার স্প্যানিশ তারকা তিরি চোটের জন্য এই মরশুমের বেশির ভাগ সময়টাই যে মাঠে নামতে পারবেন না, তা জানাই রয়েছে। এই ঘাটতি পূরণের জন্য দুই বিদেশি ডিফেন্ডার গিনির ফ্লোরেন্তিন পোগবা ও অস্ট্রেলিয়ার ব্রেন্ডান হ্যামিলকে সই করানো হয়েছে।

দলের রক্ষণ নিয়ে গত দুই মরশুম ধরেই নানা অভিযোগ উঠেছে। গত হিরো আইএসএল মরশুমে এটিকে মোহনবাগান লিগ পর্বে ২৬টি গোল খেয়েছিল, যা চার সেমিফাইনালিস্টের মধ্যে ছিল সবচেয়ে বেশি। সেমিফাইনালে হায়দরাবাদ এফসি-র কাছে প্রথম লেগে ১-৩ হারের পরে একেবারেই খুশি ছিলেন না কোচ, কর্তা, সমর্থকেরা। তাই এ বার দলবদলের শুরুতেই রক্ষণ মজবুত করার দিকে জোর দেন কোচ ফেরান্দো।

প্রীতম কোটাল, শুভাশিস বোসরা তো আছেনই। তাঁদের সঙ্গে যোগ দিচ্ছেন গত হিরো আইএসএল চ্যাম্পিয়ন হায়দরাবাদ এফসি থেকে আসা ডিফেন্ডার আশিস রাই। এই ডিফেন্স লাইন-আপের সঙ্গে ২৯ বছর বয়সি হ্যামিল ও ৩২-এর পোগবা যোগ দিলে, সবুজ-মেরুন রক্ষণ দুর্ভেদ্য হয়ে উঠতে পারে। একটা দল যত কম গোল খাবে, ততই তাদের হারের সংখ্যাও কমবে। এই তত্ত্ব অনুসরণ করেই এ ভাবে দল সাজিয়েছেন ফেরান্দো।

আক্রমণ বিভাগ নিয়ে রহস্য

রক্ষণকে শক্তিশালী করার যাবতীয় ব্যবস্থা ফেরান্দো করে ফেললেও এ বারের দল গঠনে তাঁর একটি সিদ্ধান্ত অবাক করার মতো। কোনও বিশেষজ্ঞ সেন্টার ফরোয়ার্ডকে তিনি এখনও দলে নেননি কেন, এটা অনেকেরই বোধগম্য হয়ে উঠছে না। গত মরশুম পর্যন্ত যে কাজটা করেছেন রয় কৃষ্ণা, সেই কাজটা এ বার করবে কে, সেটাই এখন কোটি টাকার প্রশ্ন। নাকি কোচের মস্তিষ্কে অন্য কোনও ছক ঘোরাফেরা করছে? শুধুমাত্র কিয়ান নাসিরিকে সামনে রাখবেন তিনি? নাকি নবনিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ান অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার পাঁচ ফুট ন’ইঞ্চির দিমিত্রিয়স পেট্রাটসকে ‘ফলস নাইন’-এর ভূমিকায় দেখা যাবে?  

ফেরান্দোর এই অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত থেকেই অনেকে মনে করছেন, তিনি কোনও জেনুইন স্ট্রাইকারকে দিয়ে আক্রমণে না উঠে হয়তো দুই উইং দিয়ে আক্রমণ শানিয়ে বিপক্ষের রক্ষণে ফাটল ধরানোর চেষ্টা করবেন। তাদের বেশির ভাগ ম্যাচেই লিস্টন কোলাসো ও মনবীর সিং দুই উইং দিয়ে আক্রমণে উঠতে দেখা গিয়েছে। পিছন থেকে তাদের দুই সাইড ব্যাক শুভাশিস ও প্রবীর দাস তাঁদের সাহায্য করতেন বা নিজেরাও মাঝে মাঝে ওভারল্যাপে গিয়ে প্রতিপক্ষের গোল এরিয়ায় হানা দিতেন। এ বার শুভাশিস থাকলেও প্রবীর নেই। সেই জায়গায় আশিস রাইকে দেখা যাবে।

উইং দিয়ে আক্রমণ সত্ত্বেও ওপরে উঠে রয় কৃষ্ণা বা ডেভিড উইলিয়ামস বাকি কাজটুকু করতেন। রয় কৃষ্ণাকে যেমন বিপক্ষের গোল এরিয়াতেই বেশির ভাগ সময় দেখা যেত, অসাধারণ সব গোলও উপহার দিয়েছেন তিনি। পেট্রাটস কিন্তু সে ধরণের খেলোয়াড় নন। তিনি মূলত অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। গোলের সুযোগ তৈরি করেন তিনি। তাঁর পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়, তিনি যত না গোল করেছেন, গোলের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন অনেক বেশি।

নতুন ফলস নাইন’?

‘নাম্বার নাইন’ হিসেবে না ভেবে পেট্রাটসকে ‘নাম্বার টেন’ হিসেবে ধরাই ভাল। অন্তত তাঁর অতীতের রেকর্ড সে রকমই বলছে। ইউটিউবে তাঁর যে গোলগুলি দেখা যায়, সেগুলি থেকেও বোঝা যায় ‘ফলস নাইন’-এর ভূমিকায় খেলার অভ্যাস রয়েছে তাঁর। দূরপাল্লার গোলেও তিনি বিশেষজ্ঞ।  

তবে ফেরান্দো তাঁকে কোন ভূমিকায় ব্যবহার করবেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ডুরান্ড কাপে বা মরশুমের প্রথম ডার্বিতে অবশ্য তাঁকে পাচ্ছে না এটিকে মোহনবাগান। কারণ, পেট্রাটস ভারতে আসছেন সেপ্টেম্বরে। ডুরান্ডের শেষ দিকে বা এএফসি কাপেও তাঁকে প্রথম এগারোয় দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা হয়তো কম। তাই সেই আকর্ষণ বোধহয় হিরো আইএসএলের জন্যই তোলা থাকবে।

তবে একটা কথা বলতেই হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত যদি দেখা যায় সত্যিই এটিকে মোহনবাগান কোনও সেন্টার ফরোয়ার্ড ছাড়াই মাঠে নামছে, তা হলে সাম্প্রতিক অতীতে তা এক নজিরবিহীন ঘটনা হয়ে উঠবে। আর কোনও বিদেশি স্ট্রাইকার ছাড়া তারা হিরো আইএসএলের আসরে নামলে, তা হবে লিগের ইতিহাসে প্রথম।

তা ছাড়া মার্কো লেস্কোভিচ, পিটার হার্টলে, অ্যালান কোস্টাদের মতো দীর্ঘদেহী ডিফেন্ডারদের বিরুদ্ধে কিয়ান নাসিরি একা কতটা লড়াই করতে পারবেন, সেটাও তো কম বড় প্রশ্ন নয়। দলের রক্ষণ সম্পর্কে ফেরান্দোর দর্শন স্পষ্ট বোঝা গেলেও তাঁর আক্রমণ-নীতি নিয়ে ধোঁয়াশা থেকেই যাচ্ছে।

এটিকে মোহনবাগান স্কোয়াড (সর্বশেষ):

গোলকিপার: অমরিন্দর সিং, অর্শ আনোয়ার শেখ, বিশাল কয়েথ;

ডিফেন্ডার: আশুতোষ মেহতা, আশিস রাই, ব্রেন্ডান হ্যামিল, গুরসিমরাত সিং গিল, তিরি, ফ্লোরেন্তিন পোগবা, প্রীতম কোটাল, রবি রাণা, শুভাশিস বোস, সুমিত রাঠি;

মিডফিল্ডার: অভিষেক সূর্যবংশী, কার্ল ম্যাকহিউ, দীপক টাঙরি, ইঙ্গসন নিঙ্গোমবাম, জনি কাউকো, লালরিনলিয়ানা হ্নামতে, লেনি রড্রিগেস, আশিক কুরুনিয়ান;

ফরোয়ার্ড: দিমিত্রিয়স পেট্রাটস, হুগো বুমৌস, কিয়ান নাসিরি, লিস্টন কোলাসো, মনবীর সিং।  

Your Comments

Your Comments