সেমিফাইনাল প্রিভিউ: পূর্বাঞ্চলীয় যুদ্ধে হাবাস-বাহিনীর বড় চ্যালেঞ্জ খালিদের নর্থইস্ট ইউনাইটেড

এ বারের হিরো আইএসএলের প্লে অফ পর্বে এমন একটা ঘটনা ঘটছে, যা এর আগে কখনও দেখা যায়নি। প্রথম সেমিফাইনালে যখন পশ্চিম ভারতের দুই প্রতিবেশী শহরের ক্লাবের লড়াই, তখন দ্বিতীয় সেমিফাইনালে পূর্ব ভারতের দুই প্রতিবেশী শহরের ক্লাব মুখোমুখি হচ্ছে। অর্থাৎ ফাইনাল যে পূর্ব বনাম পশ্চিম হতে চলেছে, এই নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এমন সেমিফাইনাল লাইন-আপ হিরো আইএসএলের ইতিহাসে কখনও দেখা যায়নি।

পশ্চিমের ডার্বি যেমন জমজমাট হচ্ছে, পূর্বাঞ্চলের দুই দলের লড়াইও নিশ্চয়ই একই রকম আকর্ষণীয় হতে চলেছে। তা অবশ্য বোঝা যাবে শনিবারই, যখন বাম্বোলিমের জিএমসি স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে লিগের দু’নম্বর এটিকে মোহনবাগান ও নর্থইস্ট ইউনাইটেড এফসি।

দুঃসময়ের চাপ

সারা লিগে ভাল খেলে আসার পরে শেষ দুই ম্যাচে জয় না পাওয়ায় এক থেকে দুইয়ে নেমে যেতে হয় এটিকে মোহনবাগান দলকে। ফলে লিগশিল্ড এবং এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার ছাড়পত্র, দুইই হাতছাড়া হয় তাদের। সেই ব্যর্থতার হতাশা সামলে এক নতুন উদ্যমে মাঠে নামতে হবে সবুজ-মেরুন বাহিনীকে, যেটা খুব একটা সহজ কাজ নয়। শেষ দুই ম্যাচের আগে টানা পাঁচটি ম্যাচে জিতেছিল যারা, তাদের আগের জায়গায় ফিরে যেতে যে কত সময় লাগবে, তা তারা নিজেরাও জানেন না। এটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ স্প্যানিশ কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসের দলের কাছে।

লিগ পর্বে এটিকে মোহনবাগানের সঙ্গে সাত পয়েন্টের ফারাক ছিল নর্থইস্ট ইউনাইটেডের। শেষ ম্যাচে কেরালা ব্লাস্টার্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে সেরা চারে নিজেদের জায়গা পাকা করে তারা। শেষ দশটি ম্যাচে অপরাজিত তারা। এই আত্মবিশ্বাসটা যথেষ্ট কাজে লাগবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় দলটিকে। তাই সে দিক থেকে দেখতে গেলে এটিকে মোহনবাগানের কাজটা যতটা কঠিন, নর্থইস্ট ততটা কঠিন রাস্তার সামনে দাঁড়িয়ে নেই। কিন্তু ম্যাচের ৯০ মিনিটে কার কেমন পারফরম্যান্স হবে, স্প্যানিশ ও ভারতীয় ফুটবল মস্তিষ্কের লড়াইয়ে কে, কাকে, কী ভাবে টেক্কা দেবে, সেটাই দেখার।

অভিষেক মরশুম স্মরণীয় করে রাখার মতোই খেলেছে এটিকে মোহনবাগান। কলকাতা ডার্বির দুই লেগেই তারা চিরপ্রতিদ্বন্দী এসসি ইস্টবেঙ্গলকে হারায়। ওডিশা এফসি-কে ৪-১ গোলের ব্যবধানে হারায় তারা এবং গত মরশুমে মোহনবাগানকে আইলিগ জেতানো কোচ কিবু ভিকুনার প্রশিক্ষণাধীন কেরালা ব্লাস্টার্সের বিরুদ্ধে পিছিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ জয় পায় সবুজ-মেরুন ব্রিগেড। এক নম্বরে থেকে শেষ করতে পারলে তা হত সোনায় সোহাগা। কিন্তু তাদের দুর্ভাগ্য শেষ দুই ম্যাচে ঠিক সময়ে জ্বলে উঠতে পারল না তারা। তার আগের পাঁচ ম্যাচে জেতার পরেও শেষ দুই ম্যাচে না জিততে পারায় দুই নম্বরেই থেকে যেতে হল তাদের।

তবে এখন সামনের দিকে তাকানোর পালা এবং শনিবার নর্থইস্টের বিরুদ্ধে কী দল নামাবে, কী ভাবে খেলবে, এগুলোই সবুজ-মেরুন শিবিরের সবচেয়ে বড় চিন্তা। গত ম্যাচে শুধু মুম্বই সিটি এফসি-র কাছে হার নয়, আরও একটা দুর্ঘটনা ঘটে গিয়েছে হাবাসের সংসারে। সেটা হল সন্দেশ ঝিঙ্গনের হ্যামস্ট্রিং পুল। যার জেরে পুরো নক আউট পর্বটাই তার খেলা হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এই ধরনের চোটে অন্তত সাত থেকে দশ দিনের বিশ্রাম প্রয়োজন হয়। সে রকমই যদি হয়, তা হলে তাঁর সেমিফাইনালের দুই লেগে খেলাই কঠিন। দল ফাইনালে উঠলে তাঁকে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। নিশ্চিত করে কিছু বলা যায় না।

দলগঠনের পরীক্ষা

সন্দেশের অনুপস্থিতিতে তা হলে কী ভাবে দল সাজাবেন হাবাস? এমনিতে চার ডিফেন্ডারে খেলতেই অভ্যস্ত হাবাস-বাহিনী। সন্দেশ ও তিরিকে মাঝখানে রেখে দুই সাইড ব্যাক হিসেবে প্রীতম কোটাল শুভাশিস বসু খেলেন। কিন্তু গত ম্যাচে শুভাশিস না থাকায় তিন ডিফেন্ডারেই খেলতে হয় তাদের। মাঝখানে কার্ল ম্যাকহিউকে রেখে বাঁ দিকে উইং ব্যাক হিসেবে প্রীতমকে খেলানো হয় ও অন্যদিকে ফর্মে না থাকা তিরি। এই কম্বিনেশন মোটেই ভাল কাজ করেনি।

এর পরে ঝিঙ্গন চোটের জন্য বেরিয়ে যান ও বিরতির পরে তিরিকেও আর নামাননি হাবাস। ঝিঙ্গনের পরিবর্তে প্রবীর দাসকে নামিয়ে তাঁকে রাইট উইং ব্যাক হিসেবে ব্যবহার করেন, যে ভূমিকায় গত মরশুম মাতিয়ে দিয়েছিলেন প্রবীর। এ বার অতটা সফল হননি তিনি। নিয়মিত খেলতেও পারেননি। কিন্তু গত রবিবার সেই সেরা প্রবীরের ঝলক দেখা যায় তাঁর পারফরম্যান্সে। শনিবারও তাঁকেই প্রথম এগারোয় রাখতে পারেন হাবাস। গত ম্যাচে বিরতিতে তিরিকে বসিয়ে তাঁর জায়গায় আনা হয় সালাম রঞ্জন সিংকে, যিনি মরশুমের প্রথম ম্যাচ খেলেন। এই ম্যাচে সুমিত রাঠিকে সেন্টার ব্যাক হিসেবে প্রথম এগারোয় রাখতে পারেন কোচ। তাঁর সঙ্গে হয়তো থাকবেন তিরি। কিন্তু প্রীতমকে তাঁর পছন্দের রাইট ব্যাকের জায়গায় পাঠিয়ে দিলে প্রবীরকে কোন জায়গায় খেলাবেন, এটা নিয়ে নিশ্চয়ই ভাবনায় পড়েছেন হাবাস।

চার ফরোয়ার্ড রয় কৃষ্ণা, ডেভিড উইলিয়ামস, মনবীর সিং ও মার্সেলো পেরেইরাকে দিয়ে শুরু করাতে পারেন তিনি। কারণ, বিপক্ষকে প্রথম থেকেই চাপে ফেলতে চাইবেন আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে। মাঝমাঠে কার্ল ম্যাকহিউ, হাভিয়ে হার্নান্ডেজ বা এডু গার্সিয়ার মধ্যে একজন শুরু করতে পারেন। কারণ, পাঁচজনের বেশি বিদেশি খেলতে পারবেন না। তাঁদের সঙ্গে প্রণয় হালদার, লেনি রড্রিগেজদের মাঠে নামার সম্ভাবনা রয়েছে।

ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই

সাতটি জয়হীন ম্যাচের পরে নর্থইস্টের স্প্যানিশ কোচ জেরার নুস লিগের মাঝপথে দায়িত্ব ছেড়ে চলে যান। তার পরে যে ভাবে দলটাকে সামলেছেন ও উন্নতির পথে নিয়ে গিয়েছেন খালিদ জামিল, তা যথেষ্ট প্রশংসনীয়। নুসের বিদায়ের পরে জানুয়ারির দলবদলে জিম্বাবোয়ের ফরোয়ার্ড দেশর্ন ব্রাউন যোগ দিয়েছেন তাঁদের শিবিরে। দলের অন্য সবাই রয়েছেন। কিন্তু সেই একই দলের মানসিকতা বদলে দিয়ে তাদের যে জায়গায় নিয়ে চলে এসেছেন খালিদ, তার পরে একটাই বার্তা সকলের কাছে পৌঁছেছে, ভারতীয় কোচেরাও কম যান না।

দলের ভারতীয় ফুটবলারদের নিয়েই লড়াইটা শুরু করেন তিনি। লালেঙমাউইয়া, ভিপি সুহের, আশুতোষ মেহতা, ইমরান খান-দের শক্তি-দুর্বলতা তাঁর মুখস্থ। তাই তিনি জানতেন কার কাছ থেকে কী পাওয়া যাবে। কে কোন জায়গায় বেশি কার্যকরী। ফলাফল, খালিদ দলের দায়িত্ব নেওয়ার পরে নর্থইস্ট ইউনাইটেড ন’টি ম্যাচের একটিতেও হারেনি এবং তারা তিন নম্বর দল হিসেবে প্লে অফে পৌঁছয়। এই দলটার আসল শক্তির জায়গা এটাই।

দলের বিদেশি ফুটবলার খাসা কামারা, লুই মাচাডো, দেশর্ন ব্রাউন, ফেদেরিকো গালেগোদের নিজেদের স্বাভাবিক পারফরম্যান্স দেওয়ার অবাধ স্বাধীনতা দেন এই ভারতীয় কোচ। যার ফলে বেঙ্গালুরু এফসি থেকে নর্থইস্টে যোগ দেওয়ার পরেই গোল পেতে শুরু করেছেন ব্রাউন। ড্রেসিংরুমে এই আত্মবিশ্বাস ও চাপমুক্ত আবহাওয়াই তাদের শক্তিশালী করে তুলেছে। যার ফলে প্রতিপক্ষ হিসেবে বেশ কঠিন হয়ে উঠেছে তারা।

লিগে দু’বারের মুখোমুখিতে প্রথমবার এটিকে মোহনবাগান ২-০ জেতে ও পরের বার নর্থইস্ট তার বদলা নেয় ২-১ জিতে। তৃতীয়বারের মুখোমুখিতে কী হবে, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। ২০১৮-১৯ মরশুমে সেমিফাইনালে বেঙ্গালুরু এফসি-র কাছে হেরে ছিটকে গিয়েছিল তারা। এ বার সেই বাধা পেরনোর সুযোগ ফের এসেছে তাদের কাছে। কিন্তু উল্টোদিকের দলটার নাম যেহেতু এটিকে মোহনবাগান ও কোচের নাম যখন হাবাস, তখন বলতেই হবে যে, ফের একটা বড়সড় হার্ডলের সামনে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয়রা।

এটিকে মোহনবাগান স্কোয়াড:

গোলকিপার: অরিন্দম ভট্টাচার্য, অভিলাষ পাল, আর্শ শেখ

ডিফেন্ডার: তিরি, প্রীতম কোটাল, প্রবীর দাস, সন্দেশ ঝিঙ্গন, শুভাশিস বসু, সুমিত রাঠি, সালাম সিং

মিডফিল্ডার: প্রণয় হালদার, হাভিয়ে হার্নান্ডেজ, এডু গার্সিয়া, কার্ল ম্যাকহিউ, লেনি রড্রিগেজ, জয়েশ রানে, রেজিন মাইকেল, শেখ সাহিল, এন ইংসন সিং

ফরোয়ার্ড: ডেভিড উইলিয়ামস, রয় কৃষ্ণা, মনবীর সিং, মার্সেলো পেরেইরা, কোমল থাটাল, মহম্মদ ফারদিন আলি মোল্লা 

সরাসরি দেখুন:

সন্ধ্যা ৭.৩০ থেকে

টিভিতে: স্টার স্পোর্টস নেটওয়ার্ক

স্ট্রিমিং: ডিজনি প্লাস হটস্টার ও জিও টিভি

 

Your Comments

Your Comments