টানটান উত্তেজনায় ঠাসা প্রায় একশো মিনিটে ওডিশা এফসি-র মুখের গ্রাস কার্যত ছিনিয়ে নিয়ে ২-২ ড্র করল মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। প্রথমার্ধে দুই গোলে এগিয়ে থাকা ওডিশা তিন পয়েন্ট হাতছাড়া করল আরমান্দো সাদিকুর জোড়া গোলে। এ দিন ওডিশার শরীরী আক্রমণের বাধা পেরিয়ে যে শেষ পর্যন্ত এক পয়েন্ট ছিনিয়ে নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারল চোট-আঘাতে জর্জরিত মোহনবাগান, সে জন্য তাদের প্রশংসাই প্রাপ্য। 

এ দিন ম্যাচ শুরুর আগে একজন ও ম্যাচ চলাকালীন তিনজন নির্ভরযোগ্য ফুটবলারকে চোটের জন্য হারায় মোহনবাগান। তা সত্ত্বেও ওডিশা এফসি-র মতো ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে ওঠা দলকে যে রুখে দিতে পারল তারা, অপরাজিত তকমা অক্ষত রাখতে পারল, তা মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। এই পয়েন্ট ভাগাভাগির ফলে ছয় ম্যাচে ১৬ পয়েন্ট নিয়ে লিগ টেবলের তিন নম্বরে রয়ে গেল কলকাতার দল ও আট ম্যাচে ১৪ পয়েন্ট-সহ চার নম্বরে ওডিশা এফসি। 

যে ম্যাচে ৩৫ বার ফাউলের বাঁশি বাজাতে হয় ও আটবার হলুদ কার্ড বার করতে হয় রেফারিকে, সেই ম্যাচে চোট পেয়ে বিরতির পর আর খেলতে পারেননি সবুজ-মেরুন শিবিরের দুই নির্ভরযোগ্য তারকা সহাল আব্দুল সামাদ ও অনিরুদ্ধ থাপা। ম্যাচের আগেই ওয়ার্ম-আপ করার সময় হ্যামস্ট্রিংয়ে চোট পান হুগো বুমৌস। থাপার জায়গায় নামা গ্ল্যান মার্টিন্সও চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন। এমনিতেই তাদের আশিক, আনোয়ার, মনবীর, পেট্রাটস চোট পেয়ে মাঠের বাইরে। এ বার সহাল, থাপা, মার্টিন্সও সেই তালিকায় নাম লেখালে পরবর্তী ম্যাচে কাদের নামাবেন, তা নিয়ে অনেক ভাবতে হবে কোচ হুয়ান ফেরান্দোকে। 

এ দিন তাঁকে আবার ম্যাচের পর বিপক্ষের খেলোয়াড়দের সঙ্গে বচসায় জড়িয়ে পড়ে লাল কার্ড দেখতে হয়। ফলে পরবর্তী ম্যাচে তিনি দলের ডাগ আউটে থাকতে পারবেন না। উত্তেজনার পারদ এতটাই চরমে উঠেছিল যে ওই ঘটনায় জড়িয়ে পড়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখতে হয় ওডিশার ব্রাজিলীয় ফরোয়ার্ড দিয়েগো মরিসিওকেও। অর্থাৎ তিনিও পরের ম্যাচে খেলতে পারছেন না। 

প্রথমার্ধে ৩১ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি থেকে ও স্টপেজ টাইমের তৃতীয় মিনিটে গোল করে ওডিশাকে এগিয়ে দেন মরক্কোর মিডফিল্ডার আহমেদ জাহু। বিরতির পর ৫৮ মিনিটের মাথায় ও ইনজুরি টাইমের চতুর্থ মিনিটে দুটি গোলই শোধ করে দেন আলবানিয়ান ফরোয়ার্ড সাদিকু। শেষ পর্যন্ত না হারার মানসিকতাই এ দিন তাদের এক পয়েন্ট এনে দেয়। 

ম্যাচের ঘণ্টাদেড়েক আগে দেওয়া টিমলিস্টে হুগো বুমৌসের নাম থাকলেও তাঁকে মাঠে নামতে দেখা যায়নি, তাঁকে দেখা যায় গ্যালারিতে। জানা যায়, ম্যাচের আগে ওয়ার্ম-আপ করতে গিয়ে চোট পান তিনি। ফলে আরমান্দো সাদিকুকে এ দিন তাঁর জায়গায় নামাতে বাধ্য হন মোহনবাগান এসজি-র কোচ হুয়ান ফেরান্দো। অর্থাৎ প্রথম দলের পাঁচজন খেলোয়াড়কে ছাড়াই এ দিন দল নামান তিনি। অন্যদিকে, রয় কৃষ্ণার জায়গায় দিয়েগো মরিসিওকে প্রথম এগারোয় রেখে দল নামান ওডিশা কোচ সের্খিও লোবেরো। কোনও কোচই এ দিন বেশি পরিবর্তনের ঝুঁকি নেননি। 

কামিংস ইদানীং খুব একটা ভাল ফর্মে নেই। এই ম্যাচেও তাঁর পারফরম্যান্সে তেমন উন্নতি দেখা যায়নি। জায়গা তৈরি করে গোলের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে তিনি তৎপর হলেও ফিনিশিংয়ের ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়নি। বরং প্রতিপক্ষের গোলের সামনে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠেন কিয়ান নাসিরি। তাঁকে সামলাতেই বেশি ঘাম ঝরাতে হয় ওডিশার ডিফেন্ডারদের। প্রথমার্ধে কামিংস বা সাদিকু— কেউই সঠিক সময়ে গোলের সামনে পৌঁছতে পারছিলেন না।   

বাঁ দিক দিয়ে একাধিক গোলের সুযোগ তৈরি করার চেষ্টা করেন লিস্টন কোলাসো, সহাল আব্দুল সামাদরা। কিন্তু সঠিক ফিনিশিংয়ের অভাবে ও ওডিশার ডিফেন্ডারদের তৎপরতায় বারবার ব্যর্থ হন তাঁরা। প্রথমার্ধে আক্রমণে সবুজ-মেরুন বাহিনীই ছিল বেশি তৎপর। কিন্তু গোলে একটিও শট রাখতে পারেননি। কনভারশন রেটের দিক দিয়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিল ওডিশা। গোলে নেওয়া দুটি শট থেকে দুটিতেই গোল তুলে নেয় তারা।  

প্রথমটি ছিল ৩১ মিনিটের মাথায়। পেনাল্টি আদায় করে নেন পুইতিয়া। বাঁদিক থেকে উঠে নরিন্দার গেহলট যে নিখুঁত ক্রসটি দেন তাঁকে, তাতে গোলমুখী হেড করেন পুইতিয়া। কিন্তু সেই বল শুভাশিসের হাতে লাগায় রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। সেই পেনাল্টি থেকেই গোল করেন আহমেদ জাহু (১-০)। 

এই গোলের মিনিট চারেক পরে নিজেদের বক্সের মধ্যে পিছন থেকে কামিংসের পা থেকে বল কাড়তে গিয়ে তাঁর পায়েই আঘাত করেন জাহু, যার পরেই পেনাল্টির জোরালো দাবি জানান মোহনবাগান খেলোয়াড়রা। কিন্তু রেফারি তাতে কর্ণপাত করেননি। 

ওডিশার ফুটবলাররা এ দিন বেশ কয়েকবার গুরুতর আঘাত করেন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের। প্রথমার্ধের মাঝামাঝি জেরি লালরিনজুয়ালার সঙ্গে সঙ্ঘর্ষে অনিরুদ্ধ থাপা মাঠে লুটিয়ে পড়েন এবং মনে হচ্ছিল তাঁকে মাঠের বাইরে যেতে হবে। প্রথমার্ধের বাকি সময়টা কোনও রকমে খেলে দিলেও বিরতির পর আর মাঠে নামতে পারেননি তিনি। 

মারাত্মক ট্যাকলের জন্য জেরিকে হলুদ কার্ড দেখানোর পরে তাঁকে সতর্কও করে দেওয়া হয়। প্রথমার্ধেই ওডিশার আরও দুই ফুটবলার গেহলট ও পুইতিয়া হলুদ কার্ড দেখেন। একেই মোহনবাগানের প্রথম দলের অনেকেই মাঠের বাইরে। তার ওপর আরও দুজন নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড় চোট পেয়ে যান। প্রথমার্ধের স্টপেজ টাইমে ফের গোল পায় তারা। এ বার নিখুঁত পরিকল্পিত গোল পান সেই জাহু। 

মোহনবাগান বক্সের সামনে পিছন থেকে কড়া ট্যাকল করে সহালের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে তাঁকে মাটিতে ফেলে দেন জাহু। সেই বল বক্সের বাঁ দিকে পান মরিসিও এবং তাঁকে অনুসরণ করে বক্সে ঢুকে পড়েন জাহু। মরিসিও বক্সে ঢুকে গোলের সামনে স্কোয়ার পাস দেন তাঁকে এবং গোলে বল ঠেলতে খুব একটা ভুল করেননি অরক্ষিত জাহু (২-০)। গোল করা ছাড়াও জাহু এ দিন সহালকেও ম্যাচ থেকে বার করে দেন। 

দ্বিতীয়ার্ধে থাপার জায়গায় লালরিনলিয়ানা হ্নামতে ও সহালের জায়গায় গ্ল্যান মার্টিন্স নামেন। ওডিশার অনিকেত যাদব নামেন জেরি মাওমিঙথাঙ্গার জায়গায়। দ্বিতীয়ার্ধের চার মিনিটের মাথাতেই কোলাসোর ফরোয়ার্ড পাস থেকে গোলের সুবর্ণ সুযোগ পেয়ে যান সাদিকু। তিনি বক্সের মধ্যে থেকেও বারের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দেন। 

৫৫ মিনিটের মাথায় পেশীতে টান ধরায় মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যান জাহু। এ দিন যতক্ষণ মাঠে ছিলেন জাহু, তার মধ্যে ছ’টি ট্যাকল করেন এবং প্রতিটিতেই সফল হন তিনি। এই প্রথম কোনও খেলোয়াড় এ মরশুমে একটি ম্যাচে ট্যাকলে একশো শতাংশ সাফল্য পেলেন। এ রকম একজন ফুটবলার মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক ভাবেই ধাক্কা খায় ওডিশা। 

প্রতিপক্ষের এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই পাল্টা চাপ বাড়ায় মোহনবাগান এবং ৫৮ মিনিটের মাথায় গোল পেয়ে যায় তারা। এই গোলের পিছনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল হেক্টর ইউস্তের। বক্সের বাইরে থেকে তিনি লব করেন বক্সের মধ্যে ডানদিকে থাকা কিয়ানকে। তিনি বক্সের মাঝখানে থাকা সাদিকুর কাছে বল পাঠান এবং সেই বলে সরাসরি গোলে শট নেন আলবানিয়ান ইউরো কাপার (২-১)। 

মোহনবাগান একটি গোল শোধ করার পরেই মাঠে নামেন রয় কৃষ্ণা। তখন মনে হয়েছিল ওডিশার আক্রমণের দায়িত্ব নেবেন দিয়েগো মরিসিও ও রয় কৃষ্ণা জুটি। কিন্তু রয়কে কিছুটা পিছন থেকে খেলতে দেখা যায়। 

লিস্টন কোলাসো এ দিন বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণে উঠলেও তাঁর আক্রমণের ধরনে কোনও বৈচিত্র না থাকায় বারবার তাঁকে আটকে দেন প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা। যে কয়েকবার তাঁকে আটকানো যায়নি, সেই কয়েকবার ফিনিশিংয়ে ভুল করেন কোলাসো। 

এ দিন একটি ব্যাপারে ধারাবাহিকতা ছিল মোহনবাগানের এবং তা হল চোট-আঘাতে। থাপার জায়গায় যিনি নেমেছিলেন, সেই মার্টিন্সও এ দিন চোট পেয়ে মাঠের বাইরে চলে যান এবং তাঁর জায়গায় নামেন দীপক টাঙরি। তিনি কিছুটা রক্ষণাত্মক ভূমিকায় চলে যান এবং শুভাশিসকে আক্রমণে উঠতে দেখা যায়। উদ্দেশ্য, অবশ্যই সমতা আনা। 

ম্যাচের শেষ দিকে প্রথম গোলে শট নিতে দেখা যায় জেসন কামিংসকে, যখন তিনি বক্সের বাইরে থেকে সোজা গোলের দিকে শট নেন এবং তা গোলকিপার অমরিন্দর আটকে দিলেও তা ছিটকে সামনে চলে আসে। কিন্তু ওই জায়গায় বল তাড়া করে আসা কোনও সবুজ-মেরুন ফুটবলারকে দেখা যায়নি। এই সময় কিয়ানের জায়গায় মাঠে নামেন সুহেল ভাট। এই সময় ওডিশাও একসঙ্গে একাধিক পরিবর্তন আনে।

নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার এক মিনিট আগে ব্যবধান বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ পায় ওডিশা, যখন মাঝমাঠ থেকে বল পেয়ে মোহনবাগান বক্সে ঢুকে বাঁ দিকে প্রাঞ্জল ভুমিকে ক্রস দেন রয় কৃষ্ণা। কিন্তু ওয়ান টু ওয়ান অবস্থায় প্রাঞ্জলের শট এগিয়ে এসে দারুন ভাবে আটকে দেন শততম আইএসএল ম্যাচ খেলা গোলকিপার বিশাল কয়েথ। ফিরতি বলে ফের শট নেন প্রাঞ্জল। এ বার বিশালের হাতে লেগে বল পোস্টে ধাক্কা খায়। 

এতক্ষণ ধরে যে গোলের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল মোহনবাগান, সেই সমতা আনার গোলটি তারা পেয়ে যায় স্টপেজ টাইমের চতুর্থ মিনিটে। কোলাসোর পা থেকে উড়ে আসা লব প্রতিপক্ষের বক্সের সামনে হেডফ্লিক করেন ইউস্তে, যা গিয়ে পড়ে সাদিকুর পায়ে। তিনি বল নিয়ে কিছুটা এগিয়ে ছ’গজের বক্সের বাইরে থেকে কোণাকুনি শট নেন গোলে (২-২)। শেষ চার মিনিটে ধাক্কাধাক্কি ও মারপিটই বেশি হয়, যার রেশ থাকে ম্যাচ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও। 

মোহনবাগান এসজি দল: বিশাল কয়েথ (গোল), ব্রেন্ডান হ্যামিল, হেক্টর ইউস্তে, শুভাশিস বোস, আশিস রাই, সহাল আব্দুল সামাদ (লালরিনলিয়ানা হ্নামতে-৪৫), অনিরুদ্ধ থাপা (গ্ল্যান মার্টিন্স-৪৫, দীপক টাঙরি-৭১), হুগো বুমৌস, লিস্টন কোলাসো, আরমান্দো সাদিকু, কিয়ান নাসিরি (সুহেল ভাট-৮৩)। 

পরিসংখ্যানে ম্যাচ 

বল পজেশন: - এটিকে মোহনবাগান এফসি ৫২.৮%- ওডিশা এফসি ৪৭.২%, সফল পাসের হার: ৭৪%-৬৭%, গোলে শট: ৩-৪, ফাউল: ১৯-১৬, ইন্টারসেপশন: ১০-১৩, ক্রস: ২০-১৩, কর্নার: ৪-২, হলুদ কার্ড: ৪-৪, লাল কার্ড: ০-১। 

ম্যাচের সেরা: আহমেদ জাহু