টানা পাঁচ ম্যাচ জিতে চলতি ইন্ডিয়ান সুপার লিগে একশো শতাংশ সাফল্যের নজির বজায় রাখল গতবারের কাপ চ্যাম্পিয়ন মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। শনিবার ভুবনেশ্বরের কলিঙ্গ স্টেডিয়ামে হায়দরাবাদ এফসি-কে তারা ২-০-য় হারায়। ম্যাচের শেষ ১১ মিনিটের মধ্যে দু’টি গোল করে দলকে পঞ্চম জয় এনে দেন যথাক্রমে ব্রেন্ডান হ্যামিল ও আশিস রাই।

সম্প্রতি এএফসি কাপে পরপর দুটি ম্যাচে হারার ফলে মানসিক ভাবে নেতিয়ে থাকা মোহনবাগান এসজি এর আগে পর্যন্ত সাদামাটা ফুটবল খেললেও ম্যাচের শেষ দিকে জয়ের গোল পেতে মরিয়া হয়ে ওঠে। সারা ম্যাচে সঙ্ঘবদ্ধ থাকার পর শেষ দশ মিনিটে (বাড়তি সময়-সহ) চিড় ধরে হায়দরাবাদ এফসি-র শক্তিশালী রক্ষণে এবং সেই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে নেয় মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট।

সবুজ-মেরুন বাহিনী ছাড়া চলতি লিগে আর কোনও দলই তাদের সব ম্যাচে জয় পায়নি। অবশ্য মোহনবাগান খেলেছেও সবচেয়ে কম ম্যাচ। পাঁচটি ম্যাচে ১৫ পয়েন্ট পেয়ে তারা আপাতত লিগ টেবলের তিন নম্বরে তারা। কেরালা ব্লাস্টার্স (৮ ম্যাচে ১৭) ও এফসি গোয়ার (৬ ম্যাচে ১৬) পরেই। তবে ম্যাচপ্রতি অর্জিত গড় পয়েন্টের দিক থেকে সবার ওপরে মোহনবাগানই। গোলপার্থক্যেও (৮) এখন সবার চেয়ে এগিয়ে তারা। আর টানা আট নম্বর ম্যাচে জয়হীন থাকা হায়দরাবাদের জায়গা হল লিগ টেবলে সবার নীচে, যা আইএসএলের ইতিহাসে কখনও হয়নি তাদের ক্ষেত্রে।

শনিবার গত আইএসএল ম্যাচের দলে চারটি পরিবর্তন করে প্রথম এগারো নামায় মোহনবাগান সুপার জায়ান্ট। মাঝমাঠে আশিস রাই ও হুগো বুমৌস ও আক্রমণে কিয়ান নাসিরি ও জেসন কামিংসকে রাখা হয় গ্ল্যান মার্টিন্স, মনবীর সিং, আরমান্দো সাদিকু ও দিমিত্রিয়স পেট্রাটসের জায়গায়। মার্টিন্স ও সাদিকু রিজার্ভ বেঞ্চে থাকলেও মনবীর ও পেট্রাটস স্কোয়াডে ছিলেন না।

অন্যদিকে, তিনটি পরিবর্তন করে প্রথম এগারো নামায় হায়দরাবাদ এফসি। জোয়াও ভিক্টর ফিরে আসেন দলে। ওসওয়াল্ডো অ্যালানিসের জায়গায়। এদিন তিনিই ছিলেন হায়দরাবাদের সেরা খেলোয়াড়। রক্ষণ থেকে আক্রমণ, সর্বত্র ছিল তাঁর অবাধা বিচরণ। যেখানে ৩-৫-২-এ খেলা শুরু করে কলকাতার দল, সেখানে ৪-৩-২-১-এ খেলা শুরু করে হায়দরাবাদ।

এ দিন শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে দুই দলই। তবে প্রথমার্ধে বল দখলের লড়াইয়ে অনেক এগিয়ে ছিল হায়দরাবাদ। দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য উল্টো ছবি দেখা যায়। শুরুর দিকে বাঁ দিকের উইং দিয়েই বেশিরভাগ গোলের সুযোগ তৈরি করে মোহনবাগান। যে দিক দিয়ে লিস্টন কোলাসো ও সহাল আব্দুল সামাদই বেশিরভাগ আক্রমণ তৈরির চেষ্টা করেন। তবে প্রথম কুড়ি মিনিটে মোহনবাগানই বেশি চাপে ছিল।

ম্যাচের বয়স যখন ১৫ মিনিট, তখন কামিংসের একটি শট গোলকিপারের হাতে লেগে কিয়ান নাসিরির কাছে এলেও গোলে শট নেওয়ার আগেই বলের নিয়ন্ত্রণ খুইয়ে ফেলেন তিনি। ২১ মিনিটের মাথায় ডানদিক থেকে বুমৌসের ক্রসে ঠিকমতো পা ছোঁয়ালে হয়তো গোল পেতেন কামিংস। কিন্তু তাঁর পায়ে বল পড়ার আগে তা ক্লিয়ার করে দেন ভিক্টর। এই ম্যাচেও অস্ট্রেলীয় বিশ্বকাপার প্রত্যাশার স্তর ছুঁতে পারেননি। বোধহয় সেজন্যই ৬৫ মিনিটের বেশি তাঁকে মাঠে রাখেননি কোচ।

২৬ মিনিটের মাথায় বুমৌসের পাস পেয়ে বক্সের মাথা থেকে গোলে শট নেন সহাল, যা আটকে দেন হায়দরাবাদের গোলকিপার গুরমিত সিং। ২৬ মিনিটের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া কোলাসোর ফ্রি কিক হাওয়ায় ভেসে ডিপ করে গোলে ঢোকার আগেই গুরমিতের হাতে লেগে তা বারে ধাক্কা খায়। ৪৪ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যে বাঁ দিক থেকে কোলাসোর কোণাকুনি হাওয়ায় ভাসানো শট বারের ওপর দিয়ে উড়ে যায়।

হায়দরাবাদের অস্ট্রেলীয় ফরোয়ার্ড জোসেফ নোয়েলস যেমন আক্রমণ তৎপর ছিলেন, তেমনই রক্ষণে এ দিন মোহনবাগানের একাধিক আক্রমণ ব্যর্থ করে দেন জোয়াও ভিক্টর। ৩৫ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যে ডানদিক থেকে নোয়েলসের কোণাকুনি শট দূরের পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। প্রথমার্ধে বল দখলের লড়াইয়ে হায়দরাবাদ এগিয়ে (৫৫-৪৫) থাকলেও গোলমুখী শটের সংখ্যায় (২-০) এগিয়ে ছিল মোহনবাগান। সারা ম্যাচে মোহনবাগান যেখানে সাতটি শট গোলের লক্ষ্যে রাখে, সেখানে হায়দরাবাদের গোলমুখী শট ছিল মাত্র একটি।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকে মোহনবাগানের দাপট ছিল উল্লেখযোগ্য। ৫১ মিনিটের মাথায় বক্সের মধ্যে বাঁ দিক থেকে কামিংসের উদ্দেশ্যে ক্রস দেন কিয়ান, যা চিঙলেনসানা সিংয়ের গায়ে লেগে দিক পরিবর্তন করায় ঠিকমতো গোলে শট নিতে পারেননি অজি ফরোয়ার্ড। প্রথম আট মিনিটের মধ্যেই দু’বার কর্নার আদায় করে নেয় তারা। তবে মিনিট দশেক পর থেকে বল দখল বাড়িয়ে খেলায় নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দিকে আনার চেষ্টা শুরু করে হায়দরাবাদ। ৫৬ মিনিটের মাথায় পেনানেনের পাস পেয়ে বক্সের বাইরে থেকে গোলে শট নেন ভিক্টর। কিন্তু তা সাইড নেটে জড়িয়ে যায়।

এ দিন কোনও দলই বেশিক্ষণ নিজেদের দখলে বল রাখতে পারেনি। বারবারই ভুল পাস দিয়ে তারা বল খোয়ায়। দুই বক্সের মধ্যেও বারবার একই ঘটনা ঘটায় কোনও দলই স্পষ্ট সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। আক্রমণে ধার বাড়াতে ৬৫ মিনিটের মাথায় কামিংসের জায়গায় আরমান্দো সাদিকুকে নামান বাগান কোচ হুয়ান ফেরান্দো।

কিন্তু সাদিকু নামার পরেও সবুজ-মেরুন আক্রমণের তীব্রতা তেমন বাড়েনি। হায়দরাবাদের শক্তিশালী রক্ষণও তাদের বেশিরভাগ প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। তবে ৮০ মিনিটের মাথায় বুমৌস ডানদিক দিয়ে তিন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে কাট ইন করে গোলে যে শটটি নেন, তা ছিল বেশ জোরালো। কিন্তু ছ’গজের বক্সের ঠিক বাইরে থেকে প্রথম পোস্টের দিকে নেওয়া সেই শট সাইড নেটে জড়িয়ে যায়।

ম্যাচের শেষ দিকে জয়সূচক গোল পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে মোহনবাগান এবং ৮৩ মিনিটের মাথায় বক্সের মাথা থেকে সাদিকুর গোলমুখী শট গুরমিত দুর্দান্ত ক্ষিপ্রতায় বাঁচান। এই চাপ অবশ্য বেশিক্ষণ রাখতে পারেনি হায়দরাবাদ। ৮৫ মিনিটের মাথাতেই গোল পেয়ে যায় তারা এবং তা কোনও ফরোয়ার্ড বা মিডফিল্ডার নয়, আসে ডিফেন্ডার ব্রেন্ডান হ্যামিলের পা থেকে। বক্সের বাইরে থেকে সহালের বাড়ানো নিখুঁত থ্রু পাস পেয়ে বাঁ দিক দিয়ে বক্সে ঢোকা হ্যামিল কোণাকুনি শটে বল জালে জড়িয়ে দেন (১-০)।

আট মিনিটের ইনজুরি টাইমের তৃতীয় মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর দুরন্ত সুযোগ পেয়ে যান সুহেল। বুমৌস ও কোলাসোর যৌথ উদ্যোগে তৈরি হওয়া সুযোগের সদ্ব্যবহারও করেন তরুণ ফরোয়ার্ড। বক্সের বাঁ দিক থেকে শট নেন তিনি। যা দুর্দান্ত সেভও করেন গুরমিত। তবে তাদের ব্যবধান বাড়ানোর চেষ্টা সফল হয় বাড়তি সময়ের ছ’মিনিটের মাথায়। হুগো বুমৌসের জোরালো শট গুরমিতের হাতে লেগে ছিটকে এলে আশিস রাই বক্সের মাথা থেকে দূরপাল্লার শট নেন ও জয় নিশ্চিত করার গোল পেয়ে যান (২-০)। এই জোড়া গোলেই আসে হায়দরাবাদের পাঁচ নম্বর হার।

মোহনবাগান এসজি দল: বিশাল কয়েথ (গোল), ব্রেন্ডান হ্যামিল, হেক্টর ইউস্তে, শুভাশিস বোস, আশিস রাই, সহাল আব্দুল সামাদ (লালরিনলিয়ানা হ্নামতে-৮৮), অনিরুদ্ধ থাপা, হুগো বুমৌস, লিস্টন কোলাসো, জেসন কামিংস (আরমান্দো সাদিকু-৬৫), কিয়ান নাসিরি (সুহেল ভট-৮৪)।

পরিসংখ্যানে ম্যাচ

বল পজেশন: - হায়দরাবাদএফসি ৫০.৩% - এটিকে মোহনবাগান এফসি ৪৯.৭%, সফল পাসের হার: ৭৮%-৮২%, গোলে শট: ১-৭, ফাউল: ৫-১০, ইন্টারসেপশন: ৭-৩, ক্রস: ১১-২২, কর্নার: ৩-৭, হলুদ কার্ড: ২-৪।

ম্যাচের সেরা: ব্রেন্ডান হ্যামিল