মেয়েদের ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্নপূরণে সাহায্য করুন, অভিভাবকদের কাছে আবেদন বেমবেম দেবীর

সারা দেশের বাবা-মা, অভিভাবকদের কাছে তাঁর একটাই আবেদন। মেয়েদের ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্নে বাধা দেবেন না। ওদের খেলতে দিন। দেশের গর্ব হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিন। তিনি নিজে যেমন হয়েছেন। তিনি ভারতীয় মহিলা ফুটবলের কিংবদন্তি ওইনাম বেমবেম দেবী।

আগামী বছর ভারতেই বসতে চলেছে মেয়েদের অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর। তাই প্রতিভাময়ী ফুটবলারদের দিকে এখন তাকিয়ে সারা দেশের ফুটবলমহল। বিশেষ করে তরুণীদের দিকে। কল্যাণীতে যে সর্বভারতীয় অনূর্ধ্ব ১৭ মেয়েদের টুর্নামেন্ট হয়ে গেল, সেই টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে এক প্রচার চালানো হয় সারা দেশে, যার স্লোগান ছিল ‘Grounds Know No Gender’, অর্থাৎ, ‘মাঠ কখনও ছেলে-মেয়ে প্রভেদ মানে না’। এই টুর্নামেন্ট ও তার প্রচারের জেরে সম্প্রতি মেয়েদের ফুটবল নিয়ে দেশজোড়া আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

বেমবেম দেবী এই প্রকল্পেরই এক অংশ, যিনি এই টুর্নামেন্টের অন্যতম দল চিতাজ-এর কোচও ছিলেন। এ দেশে পরিবার ও সংসারের চাপে বহু প্রতিভাময়ী ফুটবলারদের খেলোয়াড়-জীবন শুরু হয়েও অল্প দিনেই শেষ হয়ে যায়। ফুটবলকে জীবিকা হিসেবে নেওয়ার সুযোগ ছেলেদের যতটা আছে, মেয়েদের সেই সুযোগ এখানে তার তুলনায় অনেকটাই কম। বেমবেম দেবীই সেই প্রথম ভারতীয় মহিলাদের মধ্যে একজন, যিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, এ দেশে হাজারো সামাজিক বাধা থাকা সত্ত্বেও মেয়েদের বড় ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্নপূরণ এ দেশে সম্ভব। তাই সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি সারা দেশের বাবা-মা, অভিভাবকদের কাছে আবেদন জানিয়েছেন, বাড়ির মেয়েদের চোখে যদি সত্যিই ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্ন থাকে, তা হলে সেই স্বপ্নপূরণে যেন তাঁরা বাধা না দেন। বরং সব বাধা-বিপত্তি পেরোতে তাদের সাহায্য করেন।

বেমবেমের কাহিনী

নিজের ফুটবলার হয়ে ওঠার কঠিন লড়াইয়ের কাহিনী শুনিয়ে অর্জুন পুরস্কারপ্রাপ্ত বেমবেম দেবী বলেন, “আমার যখন ৯-১০ বছর বয়স, তখন আমি আমার স্কুলের ছেলেদের সঙ্গেই ফুটবল খেলতাম। কিন্তু খেলাটা সে ভাবে শিখিনি। ১৯৯১-এ মণিপুরে একটা টুর্নামেন্ট হয়েছিল। আমাদের পাড়ার ক্লাবের ছেলেরা বলাবলি করছিল। ফুটবল নিয়ে আমার আগ্রহ ছিল বরাবরই। তাই ওদের কাছ থেকে আমিও শুনি সেই টুর্নামেন্টের কথা। তখনই প্রথম মেয়েদের ফুটবলের কথা প্রথম শুনি। তখন থেকেই আমি ফুটবল খেলে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। ওই সময় থেকেই আমার মেয়েদের সঙ্গে ফুটবল খেলা শুরু আর ওই বছরেই আমি রাজ্যের সাব জুনিয়র দলে সুযোগ পাই। প্রথম দলে সুযোগ পাইনি ঠিকই। কিন্তু দেশের হয়ে খেলার স্বপ্ন চোখে নিয়ে সেখান থেকে অনেক কিছু মন দিয়ে শিখতে শুরু করি”।

তার পরের ঘটনা আরও আকর্ষণীয়। বেমবেমের কথায়, “ফুটবলের জন্য সব ছাড়তে তৈরি ছিলাম। ঠিক করেই নিয়েছিলাম অন্তত ২০ বছর ফুটবল খেলবই আমি। সেই ২০ বছরই খেলার পরে ২০১৫ সালে অবসর নিই আমি। কিন্তু ২০১৬ সালে ভারতে সাউথ এশিয়ান গেমস হয়। তাই দেশের জন্য আরও কিছু করার উদ্দেশ্য নিয়ে ফিরে আসি আমি। ২১ বছর দেশের হয়ে এই সুন্দর খেলাটা খেলতে পেরে আমি গর্বিত। মেয়েরাও যে পারে, সেটাই প্রমাণ করতে পেরে আমি খুবই খুশি”।  

তবে ফুটবলার হিসেবে তাঁর বড় হয়ে ওঠার এই সময়টা মোটেই সহজ ছিল না, যতটা এ পর্যন্ত পড়ে আপনার মনে হচ্ছে। প্রচুর বাধা, সমস্যা এসেছে বেমবেমের জীবনে। সে সব দিনগুলো স্মরণ করে তিনি বলেন, “প্রথম দিকে আমার বাবা চাইতেন আমি পড়াশোনায় মন দিই। কারণ, ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভ আমি পড়াশোনায় ভালই ছিলাম। কিন্তু আমার বিশ্বাস ছিল, আমি দুটোই একসঙ্গে চালাতে পারব। সেটা যদিও সহজ ছিল না। তাই বাবা মাঝে মাঝে খুব রাগারাগি করতেন। বাড়িতে অশান্তি হত। তখন মা-কে বলতাম, ‘তুমি আমাকে একটু সাহায্য করো’। এই ভাবে চলতে চলতে যখন  ১৯৯৫-এ ভারতীয় দলে ডাক পেলাম, তখন পরিস্থিতি অনেকটা ঠিক হল। তখন বাবা মেনে নিলেন। এটাই আমার সৌভাগ্য যে, মেয়েরা খেলাধুলা করতে পারবে না, এই ধারণাটা আমাদের পরিবারে কখনও ছিল না। সারা মণিপুরেই কেউ মনে করে না যে, ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে তফাৎ আছে। সে শুধু ফুটবলেই না, অন্য খেলাতেও”।

ওদের খেলতে দিন….

নিজে এই ব্যাপারে সৌভাগ্যের অধিকারী হলেও মেয়েদের সবার ভাগ্য যে তাঁর মতো ভাল হয় না, তা স্বীকার করে নিয়ে ৩৯ বছর বয়সি বেমবেম বলেন, “ভারতীয় দলে থাকার সময় আমি তামিলনাড়ুর একটা মেয়েকে চিনতাম। খুবই ভাল খেলোয়াড়। যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল ওর মধ্যে। কিন্তু ওর বাবা-মা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর বিয়ে দিতে চাইতেন এবং একদিন জোর করে ওর বিয়ে দিয়েও দেন। ফলে ও ফুটবল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।”

ফুটবলের মহিলা কিংবদন্তি অবশ্য এটাও স্বীকার করছেন যে পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করে দিয়েছে এবং বাবা-মা, অভিভাবকদের কাছ থেকে তিনি আরও উদার মানসিকতা আশা করেন। বলেন, “এখন সময় অনেক পাল্টে গিয়েছে। এখন মানুষ জানেন, বোঝেন যে, ফুটবলকে জীবিকা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে মেয়েদের সামনে রাস্তা এখন খোলা রয়েছে। তবু আমি অভিভাবকদের কাছে অনুরোধ করব, তাঁরা যেন বাড়ির মেয়েদের ফুটবল খেলতে দেন, দেশের নাম উজ্জ্বল করতে দেন তাদের”।

পরিবর্তনের হাওয়া

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কী ভাবে মহিলা-ফুটবলের পালে পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। যে সময়ে তিনি ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, সেই সময়ের তুলনায় এই সময়টা কতটা পাল্টেছে, সে প্রসঙ্গে ভারতীয় মহিলা দলের প্রাক্তন অধিনায়িকা বলেন, “আমাদের সময়ে ব্র্যান্ডেড খেলার পোশাক, বিমানে যাতায়াত এ সব কিছুই পেতাম না। এগুলো বেসিক ব্যাপার। কিন্তু এগুলো বড় মোটিভেশন। আমরা কলকাতায় তৈরি হওয়া জামাকাপড় পরে খেলতাম। আর এখন তো হিরো অনূর্ধ্ব ১৭ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের মতো টুর্নামেন্ট হচ্ছে। তাই এখন প্রতিযোগিতাও অনেক বেশি। আমরা তো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারিনি কখনও। আর এখনকার মেয়েরা এক বছরের মধ্যেই অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেতে চলেছে। এএফসি প্রতিযোগিতা আর বিশ্বকাপের মধ্যে মানের ফারাকটা কতটা, সেটা এরা বুঝতে পারবে। এখনকার মেয়েদের কথা ভেবে আমার খুব ভাল লাগছে”।

২০২০-তে ভারতে মেয়েদের অনূর্ধ্ব ১৭ বিশ্বকাপ তো হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় ভারতের সম্ভাবনা কেমন? এই প্রশ্নের উত্তরে ভারতের হয়ে ৮৫ ম্যাচে ৩২ গোল করা মণিপুরি তারকা বলেন, “পাঁচ-ছ’মাস ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে মেয়েরা। ওরা যদি একশো শতাংশ দিতে পারে, তা হলে প্রি কোয়ার্টার ফাইনালে না ওঠার কোনও কারণ দেখছি না”।

Your Comments

Your Comments