এটিকে মোহনবাগানের ঘুরে দাঁড়ানোর রহস্য শুধুই বুমৌসের ফর্মে ফেরা ও জোড়া পরিবর্তন নয়, ব্যাখ্যা বিশেষজ্ঞদের

খেলার মাঠ যেমন অনিশ্চয়তায় ভরপুর, তেমন সেখানে অদম্য মনোভাবের খেলোয়াড়ের সংখ্যাও কম নেই। সেই জন্যই তো অনিশ্চয়তাগুলো বেশিরভাগ সময়ই কেটে যায় এবং যে কোনও খেলার রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠার সবচেয়ে বড় কারণ এটাই। অনিশ্চয়তা কাটানোর চ্যালেঞ্জ এবং অদম্য মনোভাবের খেলোয়াড়দের সেই চ্যালেঞ্জ জয় করাই হল খেলা। সারা দুনিয়ায় এটাই খেলাধুলার সবচেয়ে বড় ভিত্তি এবং জনপ্রিয়তার কারণ। 

খেলার মাঠ থেকে অনেকে জীবনে চলার পথে অনিশ্চয়তা কাটানোর শিক্ষাও নেয়। কী ভাবে জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলোতে জিততে হবে, হতাশাজনক মুহূর্তগুলোকে পিছনে ফেলে আবার ঘুরে দাঁড়ানো যাবে, খেলার মাঠ ছাড়া এ সব আর কে শেখায়? 

ঘুরে দাঁড়ানোটা যে খেলার মাঠে নতুন নয়, তাতো সবই জানে। দুঃসময় কাটিয়ে সুসময়ে ফিরে আসার উদাহরণ একশো নয়, হাজারো রয়েছে। এক দল সহজ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হারার পরেই কঠিন দলকে হারিয়ে ছন্দে ফিরে এসেছে, এমন উদাহরণ অনেক দেওয়া যায়। চলতি হিরো আইএসএলে এটিকে মোহনবাগানের হায়দরাবাদ এফসি-কে হারিয়ে জয়ে ফিরে আসার মতো ঘুরে দাড়ানোর নিখুঁত উদাহরণ আর কী হতে পারে? 

গত ২০ নভেম্বর এফসি গোয়ার কাছে শুধু যে তিন গোলে হেরেছিল, তা-ই নয়, প্রায় আত্মসমর্পণ করেছিল প্রতিপক্ষের সামনে। ম্যাচের পরে সাংবাদিক বৈঠকে এসে তাদের স্প্যানিশ কোচ হুয়ান ফেরান্দো বলেন, “জানি না, এ রকম একটা পারফরম্যান্সের পরে কী বলব। আমি খুবই হতাশ আজকের পারফরম্যান্সে। কারণ, আমাদের দল আজ মাঠেই ছিল না। একটাই দল খেলেছে, এফসি গোয়া। এটাই সত্যি। এর বেশি আজ কিছু বলার নেই আমার।”

স্মরণীয় প্রত্যাবর্তন 

সেই ম্যাচের পরে কেটেছিল মাত্র পাঁচ দিন। তার পরেই লিগের সবচেয়ে শক্তিশালী দল হায়দরাবাদ এফসি-র মুখোমুখি হয় এটিকে মোহনবাগান। কিন্তু এ কী অদ্ভূত পরিবর্তন সবুজ-মেরুন ব্রিগেডের মধ্যে! পাঁচ দিন আগে যা যা ছিল না তাদের, ২৬ নভেম্বর নিজেদের মাঠে সেগুলোই ফিরে আসে যেন। একাগ্রতা, লড়াকু মনোভাব, প্রতিপক্ষের ওপর আধিপত্য বিস্তার করার প্রবণতা, নিজেদের মধ্যে নিখুঁত বোঝাপড়া, চাপের মুখে অবিচল থেকে লক্ষ্য পূরণের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠা— যে কোনও দলকে একটা কঠিন ফুটবল ম্যাচ জিততে গেলে যা যা দরকার, সে সবই ছিল এই দলটার মধ্যে। 

অথচ এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে খুঁজেই পাওয়া যায়নি এগুলো। সেই কারণেই তো কোচ বলেছিলেন, “আমাদের দলটা আজ মাঠেই ছিল না”। কী এমন হল, যার ফলে গোটা দলটা মাত্র ছ’দিনে পাল্টে গেল? ফুটবল বিশেষজ্ঞ ও হিরো আইএসএলের ধারাভাষ্যকর পল মেসফিল্ড এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন এ ভাবে, “এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের পরে অনুশীলনে ওরা কতটা পরিশ্রম করেছে, তা পরের ম্যাচেই বোঝা গিয়েছে। তা ছাড়া জনি কাউকোর অনুপস্থিতি একটা বড় ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। ওর জায়গায় কার্ল ম্যাকহিউ নামার ফলে দলের রক্ষণকে আরও মজবুত দেখাচ্ছিল। গোয়ার বিরুদ্ধে সবুজ-মেরুন ব্রিগেডে যেটা একেবারেই ছিল না, তা হল দলের শেপ। কিন্তু হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ওরা দারুন ভাবে শেপ ধরে রাখতে পেরেছিল”। 

 এ জন্য এ বারের হিরো আইএসএলের ক্রীড়াসূচীরও প্রশংসা করে মেসফিল্ড বলেন, “এ বার এমন ভাবে সূচী তৈরি করা হয়েছে যে, দলগুলো নিজেদের আমূল বদলে লড়াইয়ে ফিরে আসার যথেষ্ট সময় পাচ্ছে। কোথায় ভুল হচ্ছে আর সেগুলো শুধরে কী ভাবে কাজে লাগানো হবে, সেই অনুশীলনের জন্য যথেষ্ট সময় পাচ্ছে ওরা। এটা একটা বড় ব্যাপার”।

এটিকে মোহনবাগান বনাম হায়দরাবাদ এফসি ম্যাচের ধারাভাষ্যকার ও প্রাক্তন ভারতীয় গোলকিপার রজত ঘোষদস্তিদার বলেন, “সমস্যা ও প্রতিকুলতা একটা দলকে তার সেরা খেলাটা বের করে আনতে সাহায্য করে। খেলোয়াড়দের চ্যালেঞ্জ করতে ও সেরা পারফরম্যান্স দিতে সাহায্য করে। এফসি গোয়ার কাছে হতাশাজনক হারের পর একটা দল হিসেবে খেলে কী ভাবে ফের সাফল্যে ফেরা যায়, তার আদর্শ উদাহরণ তৈরি করল এটিকে মোহনবাগান”। 

হুগো-ম্যাজিক এবং ‘শাপে বর’ 

ফিনল্যান্ডের মিডফিল্ডার জনি কাউকো হাঁটুর চোটের জন্য কার্যত এই মরশুম থেকেই ছিটকে গিয়েছে। কিন্তু এটাই ‘শাপে বর’ হয়েছে বলে মনে করেন মেসফিল্ড। সে দিন মাঝমাঠে কার্ল ম্যাকহিউ নিজের সেরাটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। মাঝমাঠে প্রায় একার দায়িত্বেই প্রতিপক্ষকে বারবার প্রতিহত করার চেষ্টায় সফল হন তিনি। বেশিরভাগ ডুয়ালেই ম্যাকহিউ বল ছিনিয়ে নেন প্রতিপক্ষের পা থেকে। তিনি খেলায় এটিকে মোহনবাগানের মাঝমাঠকে অনেক সঙ্ঘবদ্ধ দেখায়। সারা ম্যাচে মাঝমাঠ থেকে দুই উইংয়ে বল সাপ্লাই করতে পারেননি হায়দরাবাদের আকাশ মিশ্র, নিখিল পূজারি, জোয়াও ভিক্টর, হীতেশ শর্মারা। 

শুধু কাউকোর জায়গা ম্যাকহিউ নন, দিমিত্রি পেট্রাটোসের জায়গায় আশিক কুরুনিয়ান খেলার ফলেও সবুজ-মেরুন বিভাগের আক্রমণ অন্য মাত্রায় চলে যায়। বাঁ দিক দিয়ে আশিক ও লিস্টন কোলাসো এবং ডানদিক থেকে মনবীর ও বুমৌস আক্রমণে ঝড় তোলা শুরু করেন। হায়দরাবাদ এফসি-র ডিফেন্ডাররা অনেকটা উঠে খেলায় প্রতি আক্রমণের জন্য কোলাসোদের সামনে বিস্তৃত জায়গাও খুলে যায়। সেই জায়গা কাজে লাগিয়েই সে দিন আগ্রাসী হয়ে ওঠেন তাঁরা। 

এই ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে হুগো বুমৌস একটা বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করেন প্রাক্তন ভারতীয় ফুটবলার তথা কলকাতার তিন প্রধান ক্লাবের হয়ে মিডফিল্ডার ও ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলা সৈয়দ রহিম নবি। তাঁর মতে, “বুমৌস মুডি খেলোয়াড়। কবে ভাল খেলবে কেউ বলতে পারে না। তবে বড় খেলোয়াড়রা যেমন বড় ম্যাচে ভাল খেলে, তেমনই সে দিন বুমৌস হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে দুর্দান্ত খেলেছে। গোলটাও করেছে অসাধারণ। বল ধরে রেখে তিন ডিফেন্ডারকে একদিকে নিয়ে আসার পরে ফাঁকায় থাকা আশিককে বল দেওয়া ও তাকে ফলো করে গোল করা, বুমৌসের মতো খেলোয়াড়রা এ রকম গোল করবে এটাই স্বাভাবিক ও সেটাই আমরা দেখতে চাই।  এছাড়া পুরো মাঠ জুড়ে খেলেছে ও। সে দিনের জয়ে বুমৌস অবশ্যই একটা বড় ফ্যাক্টর”। 

আশিকের ভূয়ষী প্রশংসা করে রজত বলেন, “বুমৌস এই দলটার মাঝমাঠের প্রাণভ্রমরা, এটা যেমন ঠিক, তেমনই আশিকের পারফরম্যান্সের কথা বলতেই হবে। বুমৌস যখন গোলটা সাজাচ্ছিল, তখন তাকে ফলো করে একেবারে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় আশিক পৌঁছে গিয়েছিল”। শুধু আক্রমণেই নয়, রক্ষণেও আশিক সমান ভূমিকা পালন করেছেন বলে মনে করেন নবি। বলেন, “রক্ষণের সময়ও ও একইরকম তৎপর ছিল। প্রত্যেকটা বলে ও সঠিক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। কোন বলটা ধরে রাখতে হবে বা কোনটা ছেড়ে দিতে হবে, সেটা ও খুবই ভাল জানে। ডানদিকের উইং দিয়ে এত দ্রুত উঠেছে যে বিপক্ষের ডিফেন্ডারদের সব সময় ব্যস্ত রেখেছিল। খুব তাড়াতাড়ি বক্সের মধ্যে ঢুকতে পারে ও”। দলে দু’টি পরিবর্তনই যে শাপে বর হয়েছে, তা নিয়ে একমত রজত। 

আসল কারণ ‘অন্য’!

ফেরান্দো বরাবরই বলে আসছেন, তিনি চান দল হিসেবে এটিকে মোহনবাগান ভাল খেলুক। তা হলেই সাফল্য আসবে। হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে খেলতে নামার আগের দিন সাংবাদিক বৈঠকে তিনি বলেছিলেন, “আমাদের দল এখনও অনেক উন্নতি করবে। আরও ভাল খেলার ক্ষমতা এই দলের মধ্যে আছে। প্রতি ম্যাচে একই রকম ভাল খেলাটাও জরুরি। এই দলের ওপর যথেষ্ট আস্থা রয়েছে আমার। আশা করি, হায়দরাবাদ ম্যাচ থেকে আমাদের দল প্রতি ম্যাচে সমান ভাল খেলবে”। এবং সেটাই হল। আসলে হিরো আইএসএলে এতটাই কড়া মোকাবিলা হয় প্রতি দলের মধ্যে যে, সেখানে দলগত ভাবে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে না খেলতে পারলে সাফল্যের রাস্তায় হাঁটা কঠিন। কোনও দু-একজন ফুটবলারের ওপর নির্ভর করে এই লড়াইয়ে জেতা সম্ভব নয়। 

এই দলগত পারফরম্যান্স নিয়ে রজত বলেন, “প্রতিটি বিভাগের খেলোয়াড়দেরই কিছু না কিছু অবদান ছিল। শুধু আক্রমণ নয়, মাঝমাঠ, ডিফেন্সেও যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল ওরা। গোলকিপার বিশাল কয়েথও যথেষ্ট ভরসা জুগিয়েছে। দল হিসেবে ওদের এই অসাধারণ উন্নতিই এটিকে মোহনবাগানকে ফের সাফল্যের পথে এনে দেয়। গত ম্যাচে তিন গোলে শোচনীয় হারের পরে এ ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ওরা চারিত্রিক দৃঢ়তার পরিচয় দিল”। 

সে দিন ম্যাচের পর হায়দরাবাদ এফসি-র কোচ মানুয়েল মার্কেজও স্বীকার করে নেন এটিকে মোহনবাগানের আধিপত্য। বলেন, “আজকের ম্যাচে জয়টা এটিকে মোহনবাগানেরই প্রাপ্য ছিল। আমরা জেতার মতো কিছুই করতে পারিনি এই ম্যাচে। এ ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না”। 

সামনে কঠিন রাস্তা 

ভবিষ্যতেও সাফল্যের সরণিতে থাকতে গেলে ও নক আউটের লড়াই জিততে গেলে এ ভাবেই দলগত পারফরম্যান্স দিয়ে যেতে হবে সবুজ-মেরুন বাহিনীকে। সামনে আরও অনেকগুলো কঠিন ম্যাচ রয়েছে। ডিসেম্বরে বেঙ্গালুরু এফসি, জামশেদপুর এফসি, ওডিশা এফসি-র মতো দলের বিরুদ্ধে যেমন ম্যাচ রয়েছে, তেমনই এফসি গোয়ার বিরুদ্ধে তাদের ফিরতি লিগের ম্যাচও রয়েছে এ মাসেই। জানুয়ারিতে নতুন খেলোয়াড়ও যোগ দেবেন দলের সঙ্গে। তাঁদের নিয়ে নতুন করে দলের মধ্যে বোঝাপড়া তৈরি করাতে হবে যেমন, তেমনই নতুন খেলোয়াড়েরা দলের সঙ্গে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারবেন, সেটাও বড় প্রশ্ন। তই ডিসেম্বরে অনেকটা কাজ গুছিয়ে রাখতে হবে তাদের এবং নক আউটে যাওয়ার রাস্তা পরিস্কার করে রাখতে হবে।

কিন্তু ধারাবাহিকতার অভাব কিছুটা হলেও ভোগাচ্ছে সবুজ-মেরুন ব্রিগেডকে। যদিও এই সমস্যা নিয়ে খুব একটা বিচলিত বা চিন্তিত দেখাচ্ছে না কোচকে। তিনি বলছেন, “এটা ফুটবলে হয়ে থাকে। ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের আবেগ, অনুভূতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবল শুধু দক্ষতা বা কৌশল দিয়ে হয় না, আবেগও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দল টানা ভাল বা খারাপ পারফরম্যান্স দেখায় না। যখন আমরা সফল হই, তখন খুশি থাকি। তবে যখন খারাপ সময় যায়, তখন খেলোয়াড়দের পাশে থাকাটা জরুরি। ওদের ছোটখাটো ব্যাপারগুলোতে উন্নতি করতে সাহায্য করা উচিত। চাপে পড়ে অনেক সময় ভাল দলও খারাপ খেলে। গতবার প্রথম সেমিফাইনালে আমরা হেরে যাওয়ার পরে দ্বিতীয় লেগে আমরা খুবই ভাল খেলেছিলাম। কিন্তু ওদের সামনে আমাদের ভাগ্য সহায় না হওয়ায় আমরা সে দিন জিতেও ছিটকে যাই। তবে সেটা গত মরশুমের কথা। সে কথা এখন আর মনে রাখতে চাই না”। 

দলের ওপর আস্থা রয়েছে কোচের, এই এক বিবৃতিই একটা দলকে চাঙ্গা করে তুলতে পারে এবং এটিকে মোহনবাগানও শিবিরও যথেষ্ট উজ্জীবিত কোচের এই ইতিবাচক আচরণে। কিন্তু যুদ্ধ যখন অনেক বাকি। লিগে এখনও ১৩টি ম্যাচ খেলতে হবে তাদের। এই ১৩ ম্যাচে অনেক চড়াই-উতরাই পেরোতে হবে তাদের। জানুয়ারির দলবদলে নতুন করে দল গড়ে এগোতে হবে তাদের। ফলে একটা ম্যাচ ভাল খেলে ঘুরে দাঁড়ানো মানেই যে দল সঠিক রাস্তায় চলে এল, তার কোনও মানে নেই। এই রাস্তা থেকে ছিটকে যেতে একটা-দুটো ম্যাচই যথেষ্ট। এমনই কঠিন জায়গা এই হিরো হিরো ইন্ডিয়ান সুপার লিগ। 

ডিসেম্বরে এটিকে মোহনবাগানের ম্যাচ: ৩- বনাম বেঙ্গালুরু এফসি (বেঙ্গালুরু), - বনাম জামশেদপুর এফসি (কলকাতা), ১৫- বনাম ওডিশা এফসি (ভুবনেশ্বর), ২৪- বনাম নর্থইস্ট এফসি (গুয়াহাটি), ২৮- বনাম এফসি গোয়া (কলকাতা)।

Your Comments

Your Comments