তিনিই নায়ক, তবু রয় কৃষ্ণার কাছে তাঁর ‘পরিবার’-ই সেরা

ওয়েলিংটন ফিনিক্সের সঙ্গে পাঁচ বছরের সম্পর্ক ত্যাগ করে ক্লাব ছেড়ে চলে আসার সময়, সমর্থকদের উদ্দেশে যে বার্তা দিয়েছিলেন রয় কৃষ্ণা, তাতেই স্পষ্ট বলেছিলেন, “ওয়েলিংটন ফিনিক্স পরিবারকে অসংখ্য ধন্যবাদ পাঁচটা অবিস্মরণীয় বছর আমাকে উপহার দেওয়ার জন্য। এই সিদ্ধান্তটা নেওয়া আমার পক্ষে মোটেই সহজ ছিল না। কারণ, এই ক্লাব আমার জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। যদি এ-লিগেই থাকতাম, তা হলে ওয়েলিংটন ফিনিক্সের সঙ্গ ছাড়তাম না। কারণ, ক্লাব ও সমর্থকদের নিয়ে দারুণ একটা কমিউনিটি তৈরি হয়ে গিয়েছিল”।

ফুটবল যে টিমগেম, দল হিসেবে খেলতে হয়, তা কে না জানে? এটিকে এফসি-র কোচ আন্তোনিও লোপেজ হাবাসও আলাদা করে তাঁর দলের কোনও খেলোয়াড় সম্পর্কে বলতে চান না। তাঁর পুরোটাই দলকেন্দ্রিক। কিন্তু রয় কৃষ্ণা আরও এক ধাপ ওপরে। তিনি মনে করেন, দল নয়, এটা আসলে একটা পরিবার। আর তিনি সেই পরিবারের জন্যই মাঠে নামেন। দলকে একটা পরিবার মনে করার এই প্রবণতা পেশাদার ফুটবল দুনিয়ায় বড় একটা দেখা যায় না।

শনিবার যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে দাঁড়িয়ে যা বললেন, তা  রয়ের এই মানসিকতারই পরিচয় দেয়। প্রথমার্ধে সারা ৪৫ মিনিট গোল করতে না পারার জ্বালায় যখন ছটফট করছেন দলের অন্যরা, তখন রয় দ্বিতীয়ার্ধে নেমে একাই ১৮ মিনিটের মধ্যে তিন-তিনটে গোল করে ফের একবার এটিকে এফসি-র সমর্থকদের নিশ্চিন্ত করলেন। হ্যাটট্রিক করে দলকে তুললেন হিরো আইএসএলের সেমিফাইনালে।

তার পরে কী বললেন? স্টেডিয়াম ছেড়ে বেরনোর সময় মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের বললেন, “আজকের জয় শুধু আমার কৃতিত্বে আসেনি। আমি তিনটে গোল করেছি ঠিকই। কিন্তু আমার মনে হয় পুরো দলটাই ভাল খেলেছে। তাই প্রত্যেকের কৃতিত্ব সমান”।  তিনিই যেন পরিবারের সেই স্বার্থহীন কর্তা, যাঁর উপরেই নির্ভরশীল তাঁর পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা, কিন্তু তিনি নিজে বলেন, পরিবারটা তো চলছে ওদের জন্যই। তা এটিকে পরিবারের সবচেয়ে রোজগেরে সদস্যটির বক্তব্য এ রকম, “আমি আমার কাজ করে চলেছি মাত্র। দলের জন্য নিজের সেরাটা দিতে চাই সব সময়”।

দলের ৩০টি গোলের মধ্যে ১৩টি তাঁরই করা। মাঝে যখন টানা পাঁচটি ম্যাচে একটিও গোল করতে পারেননি, তখন যে হতাশায় ডুবে থেকেছেন, তাও নয়। তখনও উত্তেজনার পারদ একই উচ্চতায় চড়িয়েছেন, তখনও উদ্যমে ও চেষ্টায় কোনও ঘাটতি ছিল না। নিজে পারেননি, কিন্তু অন্যরা যে পেরেছেন, তাতেও তাঁর কৃতিত্ব কম ছিল না। সেই সময়ের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে বলেন, “যখন গোল করতে পারি না, তখন গোল করতে সাহায্য করি। আবার যখন সেটাও করা সম্ভব হয় না, তখন দলকে অন্য যে কোনও ভাবে সাহায্য করতে চাই। স্ট্রাইকারদের মাঝে মাঝে গোলহীন সময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। তবে আমি কখনও পরিশ্রম থেকে দূরে থাকিনি। শেষ পর্যন্ত হ্যাটট্রিকটা পেয়ে তাই খুব ভাল লাগছে”।

শনিবারের ম্যাচে প্রথমার্ধে গোলের খরার পরে দ্বিতীয়ার্ধে তাঁর হ্যাটট্রিক আসার পিছনেও তাঁর এই নতুন পরিবারকেই কৃতিত্ব দেন রয়। ম্যাচের পরে indiansuperleague.com-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “সবাই খুব ভাল খেলেছে, ডিফেন্স খুব ভাল হয়েছে। গোলটা বাজে খেলাম অবশ্য। তবে সব মিলিয়ে গর্ব করার মতো ফুটবলই খেলেছি আমরা। আমাদের আজ ভাল ডিফেন্ড করা দরকার ছিল। যখন কাউন্টার অ্যাটাকে উঠছিলাম, তখন মাথা ঠাণ্ডা রেখে বোঝাপড়াটা ঠিক রাখা দরকার ছিল। সুযোগ কাজে লাগানোর প্রয়োজন ছিল। দ্বিতীয়ার্ধে আমি তিনটে খুব ভাল পাস পাই। সেগুলোকে আমি ঠিকমতো কাজে লাগাতে পেরেছি বলে গোল পেয়েছি। সবাই খুব ভাল খেলেছে, ডিফেন্স খুব ভাল হয়েছে। গোলটা বাজে খেলাম অবশ্য। তবে সব মিলিয়ে গর্ব করার মতো ফুটবলই খেলেছি আমরা”।

নিজেও দল ব্যাপারটাতে বেশি জোর দেন কোচ হাবাস। তাই কোনও সাংবাদিক বৈঠকেই কোনও একজন বা দু’জন খেলোয়াড়কে নিয়ে আলাদা করে মন্তব্য করতে চান না। তিনি সব সময় দলে বিশ্বাসী, তারকায় নয়। তাঁর দলে আমি-র চেয়ে আমরা-র গুরুত্ব অনেক বেশি। হাবাসের এই সংস্কৃতির সঙ্গে তাই একেবারে মানিয়ে গিয়েছেন রয় কৃষ্ণা। যার ফলে আগামী মরশুমের দলেও ইতিমধ্যেই তাঁকে ‘কনফার্ম’ করে দিয়েছেন হাবাস। কোচের প্রতিও যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল রয়। কতটা, তা তাঁর পরের কথাগুলো থেকেই বোঝা যায়। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়, কোচ বলছেন, ওডিশা ম্যাচটাই এটিকে-র সেরা পারফরম্যান্স, তখন রয় বলেন, “এটা সেরা ম্যাচ কি না, খেলোয়াড় হিসেবে, তার বিচার করা খুব কঠিন। তবে কোচ ভাল বুঝতে পারেন। উনি যদি বলে থাকেন, এটাই সেরা পারফরম্যান্স, তা হলে সত্যিই তাই”।

কয়েক দিন আগে রয়ের স্ত্রী নাজিয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। কলকাতার এক নার্সিং হোমে ভর্তি করতে হয়েছিল তাঁকে। তবু সেই সময়েও মাঠে নিজেকে উজাড় করে দিতে এতটুকু কার্পন্য করেননি। সেই দুঃসময়ে তাঁর ফুটবল পরিবার-এর সদস্যরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এখন অন্য আর একজনের দুঃসময়েও রয় সকলকে নিয়ে তাঁর পাশে। তিনি অগাস্টিন ইনিগেজ গার্সিয়া। স্পেনে তাঁর পরিবারে এক গুরুতর সমস্যা দেখা দেওয়ায় রবিবারই দল ছেড়ে দেশে চলে যেতে হয় তাঁকে।

শনিবার রাতে জয়ের উৎসবের সাথে সাথে তাই আগুসকে (গার্সিয়ার ডাকনাম) হারানোর বিষাদও ছড়িয়ে পড়ে এটিকে শিবিরে। রয় বলেন, “এই জয়টা আগুসকে উৎসর্গ করছি আমরা। ওকেই এই জয় উপহার দিতে চাইছিলাম আমরা। ও খুব আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছে। ওকে আমাদের ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। কারণ, ওর পরিবারে একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে, খুব দুঃসময়ের মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে ওকে। আশা করি সব ঠিক হয়ে যাবে। ওর আর ওর পরিবারের প্রতি আমাদের শুভেচ্ছা রইল। সব যেন দ্রুত ঠিক হয়ে যায়। আশা করি আমাদের এই সাফল্য ওকে মোটিভেট করবে ও মানসিক ভাবে আরও শক্তিশালী করে তুলবে”।

সেমিফাইনালে পৌঁছে গেলেও এ বার এটিকে শিবিরের লড়াই লিগে এক নম্বরে টিকে থাকার। পরের দুই ম্যাচে তাদের তাই জিততেই হবে। তাই রয় কৃষ্ণা বলছেন, “এই জয়ে আমাদের আবেগে ভেসে গেলে চলবে না। কারণ, পরের সপ্তাহে আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ আছে আমাদের, চেন্নাইয়ের বিরুদ্ধে। ওরা যথেষ্ট ভাল দল। কঠিন ম্যাচ হতে চলেছে আমাদের। আজকের জয়টা অবশ্যই উপভোগ করব। তবে মঙ্গলবার থেকে আবার প্রস্তুতি শুরু হবে। পরের ম্যাচের প্রস্তুতির জন্য আমাদের প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে”।

Your Comments

Your Comments